“ফণী”র বিষাক্ত ফণার “ছোবল” পড়ার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে “কুপ্রভাব”

 

 

মদনমোহন সামন্ত, কলকাতা, ২রা মে :
ভরা বৈশাখের অস্বস্তিকর দিনগুলির দাবদাহ থেকে খানিক রেহাই দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বইতে শুরু করেছে ঝোড়ো হাওয়া। সৌজন্যে “ফণী”। দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে গত ২৬ এপ্রিল ভোর তিনটে নাগাদ যে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছিল তা দক্ষিণ-পশ্চিমে এগিয়ে ২৭ এপ্রিল সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। সাপের মত এঁকেবেঁকে চলা ঘূর্ণিঝড়টি সমুদ্রের উপরে আরও শক্তি সঞ্চয় করে “অতি গভীর নিম্নচাপ”এ পরিণত হয়। ঘূর্ণিঝড়টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে বাংলাদেশের দেওয়া নাম “ফণী” (সাপ) হিসাবে। ২০০৯ সালে ২৪-২৫ মে বয়ে যাওয়া “আয়লা” ঘূর্ণিঝড়ের দশ বছর পর ২০১৯ এর তিন-চার মে ফণা বাগিয়ে ছুটে আসছে “ফণী”। বৃহস্পতিবার দুই মে সকাল সাড়ে এগারোটায় আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিনে জানানো হয়েছে প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমে এগিয়ে যাওয়া বর্তমানে পারিভাষিক শব্দে “এক্সট্রিমলি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম” “ফণী” বাঁক নিয়ে উত্তর উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে চলেছে । তার এগোনোর গতি ঘন্টায় ১৫-২০ কিলোমিটার। ফণী’র চক্রবাতে ঝোড়ো বাতাসের গতিবেগ অবস্থান ভেদে ঘন্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার থেকে ১৮০-২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। “ফণী”র উপরে বিশাখাপত্তনম এবং মছলিপত্তনম থেকে ডপলার ওয়েদার রাডার মাধ্যমে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।

আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের অধিকর্তা সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, আজ সকাল সাড়ে এগারোটায় সেটি দীঘা থেকে ৫৫০ কিলোমিটার এবং পুরী থেকে ৩৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর-এর উপর শুক্রবার ৩ মে বিকালের মধ্যে সেটি ওডিশা উপকূলের দিকে গিয়ে গোপালপুর এবং চাঁদবালি হয়ে এগিয়ে যাবে। তখন ঝোড়ো হাওয়া বইবে ঘন্টায় ১৭০-২০০ কিলোমিটার বেগে। এর প্রভাবে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ স্থানে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু কিছু স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে দুই মেদিনীপুর , হাওড়া , হুগলি, কলকাতা, ঝাড়গ্রাম এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে প্রবল বর্ষণ হতে পারে। উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। বাতাস বইতে পারে ঘন্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে। শনিবার গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। সকালের দিকে ঝোড়ো বাতাস বইতে পারে ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে। সমুদ্র উত্তাল থাকবে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে বারণ করা হয়েছে। রবিবার পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে জোয়ারের ঢেউয়ের চেয়েও দেড় মিটার উঁচু ঢেউয়ের সম্ভাবনা থাকায় সমুদ্রে থাকা মৎস্যজীবীদের ফিরে আসতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত পর্যটকদের সমুদ্রে নামতে নিষেধ করা হয়েছে। ওডিশা প্রশাসন বৃহস্পতিবারের মধ্যে পর্যটকদের পুরী ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব রেল এজন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। ওডিশাতে বৃহস্পতিবার থেকে আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে সমস্ত রাজ্য সরকারি, সরকার পোষিত এবং অসরকারী প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুল গুলিতে অত্যধিক গরম এবং “ফণী”র দুর্যোগের আশঙ্কায় গ্রীষ্মকালীন অবকাশ এগিয়ে ৩ মে থেকে শুরু করার কথা জানানো হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষ হবে ৩০ জুন ।মৌসম ভবন থেকে কলকাতার জন্য হলুদ সর্তকতা জারি করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হেলিকপ্টার ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর কিছু পূর্ব নির্ধারিত নির্বাচনী জনসভা বাতিল অথবা সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সড়ক পথে কয়েকটি জনসভায় অংশগ্রহণ করছেন। দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ে এবং পূর্ব রেলওয়ের বহু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য সতর্ক রাখা হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশকে। নবান্নে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করা হয়েছে। ত্রাণ ও আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কলকাতা কর্পোরেশনের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে গাছ পড়ে রাস্তা অবরুদ্ধ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এক কথায় “ফণী”র বিষফণার ছোবল সামলাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে রাখা হয়েছে। আগ্রহীদের জন্য জানিয়ে রাখা যাক ঘূর্ণিঝড়টির নাম “ফণী” অর্থাৎ সাপ রাখা হয়েছে বাংলাদেশের দেওয়া নামে। ১৯৫৩ সাল থেকে বিশ্ব আবহাওয়াবিজ্ঞান সংগঠন “ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন ( WMO )” ঘূর্ণিঝড়গুলির নাম রাখা শুরু করে। ২০০৪ সাল থেকে ভারতে ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা শুরু হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান এবং থাইল্যান্ড — আটটি দেশ মিলে আঞ্চলিকভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঘূর্ণিঝড়ের নাম রেখে থাকে। এই আটটি দেশ আটটি করে নাম স্থির করে রেখেছে। যা রাখা আছে WMOতে। ইংরাজি বর্ণমালার QUXYZ বাদে বাকি ২৫ টি বর্ণ দিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের নামের আদ্যক্ষর স্থির করা হয়। বিজোড় সালে স্ত্রীলিঙ্গ বাচক নাম এবং জোড় সালে পুংলিঙ্গ বাচক নাম রাখা হয়। আমেরিকাতে কোন বছরে ২১টির বেশি ঘূর্ণিঝড় হলে গ্রীক বর্ণমালার আলফা, বিটা, গামা ইত্যাদি নাম ব্যবহার করা হয়।

785total visits,3visits today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *