বিদ্যাসাগর কলেজে বিদ্যাসাগরের মূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রাক্তনীদের অসন্তোষ

 

মদনমোহন সামন্ত,১১ জুন, কলকাতা : আজ মঙ্গলবার বিদ্যাসাগর কলেজে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাবেন রাজনৈতিক ডামাডোলে বিদ্যাসাগরের ভেঙ্গে ফেলা মূর্তির পরিবর্তে রাজ্য সরকারের তৈরি করে দেওয়া নতুন মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে। অরাজনৈতিক মনীষী বিদ্যাসাগর যে এই উপলক্ষে ক্রমাগত রাজনৈতিক জটিল আবর্তে খাবি খাবেন এবং সেটাও তাঁর নিজের রাজ্যেই তা তিনি ঘোর দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেন নি। তাঁর মূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা নিয়েও চলেছে রাজনৈতিক টানাপড়েন। ১৪ মে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পরদিন কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা কারও সাহায্য ছাড়াই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার লিখিত প্রস্তাব দেয় পরিচালন সমিতিকে। জরুরি বৈঠকে তা গৃহীতও হয়। কিন্তু রাজনীতির কারবারীরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার ছলে উপর্যুপরি যেন বিদ্যাসাগরের ভাবমূর্তিকেই ভূলুন্ঠিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। সমবেদনা-সহমর্মিতার আড়ালে বিজেপি কেন্দ্র সরকারের মাধ্যমে এবং তৃণমূল রাজ্য সরকারের আড়ে দ্বৈরথে নেমে পড়ে।পরিবারের ভাবাবেগ চাপা পড়ে যায়। অথচ কর্তৃপক্ষের তরফে যা করা উচিত ছিল সেই পড়ুয়াদের ভাবাবেগ জলাঞ্জলি দিয়ে মেরুদন্ডহীন হয়ে তারা আত্মসমর্পণ করল সরকারের কাছে, সস্তা রাজনৈতিক স্বার্থের পদতলে। এবার বিদ্যাসাগর অপমানিত হলেন তাঁর নামাঙ্কিত কলেজে। হা ঈশ্বরচন্দ্র, এমন অর্ধচন্দ্র কি আপনার সত্যি প্রাপ্য ছিল ! এমন পরিস্থিতিতে আজ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন তখন সে অনুষ্ঠানে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাক্তণীরা। শুধু তাই নয় অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রাক্তনীদের শিক্ষক এবং ও শিক্ষক-কর্মচারীদের থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে কলেজের একাধিক মহল ক্ষুব্ধ। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাক্তনীদের বক্তব্য : গত ১৪ই মে সন্ধ্যায় এক রাজনৈতিক সংঘর্ষে আক্রান্ত হয় আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় বিদ্যাসাগর কলেজ এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুর্তিটি নৃশংস ভাবে ধ্বংস করা হয়। এ বিষয়ে আমরা তৎক্ষণাৎ চরম উদ্বেগ প্রকাশ করি এবং কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে পরদিনই, অর্থাৎ ১৫ই মে কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লিখিত প্রস্তাব জমা দিই, যা ওইদিনই অনুষ্ঠিত কলেজ পরিচালন সমিতির বৈঠকে প্রশংসিত ও গৃহীত হয়েছিল। এটিই ছিল মুর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে কলেজের কাছে পৌঁছোন প্রথম লিখিত প্রস্তাব। কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের কয়েকদিন অপেক্ষা করতে বলেন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্যে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুর্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে কথা বলতে বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাক্তনীর সম্পাদক প্রাক্তনী অনন্তমোহন সিনহা ৬ জুন কলেজের অধ্যক্ষ মহাশয়ের সাথে যোগাযোগ করেন। প্রাক্তনীদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব কলেজকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি যে মুর্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সর্বপ্রথম লিখিত প্রস্তাব ছিল, এবং সেটি পরিচালন সমিতির বৈঠকে গৃহীতও হয়েছিল, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি কলেজের সিদ্ধান্ত জানতে চান। কলেজের তরফ থেকে জানানো হয় যে, রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আগামী ১১ই জুন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটি মুর্তি কলেজে বসানো হবে। যেহেতু এটি রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত, এ বিষয়ে কলেজ পরিচালন সমিতি বা অধ্যক্ষ মহাশয়ের অসহায়তা প্রাক্তনীরা অনুধাবন করতে পারছে। সেই সঙ্গে প্রাক্তণীরা এও লক্ষ্য রেখেছে যে মুর্তি ভাঙার অনভিপ্রেত ঘটনা থেকেই বিষয়টি নিয়ে আগাগোড়া বিভিন্ন স্তরে দেশজোড়া রাজনৈতিক ক্রিয়াশীলতা ছিল, এবং এখনও চলছে। বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাক্তনী একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, এবং প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের আবেগই আমাদের কাছে প্রাথমিক বিবেচ্য। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে একাধিক বার এটি প্রকাশিত হয়ে আসছে যে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুর্তি প্রাক্তনীরা নিজেরাই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান, কারো কোন সাহায্য ছাড়াই। সুতরাং এ বিষয়ে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল অবহিত থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রাক্তণীরা এও মনে করে, বিষয়টি শতাব্দী প্রাচীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ স্বায়ত্ব শাসনের অন্তর্ভুক্ত, এবং প্রাক্তণীরা যার শরিক। তাই মূর্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে যে কোন তরফের সক্রিয়তা ও একতরফা সিদ্ধান্ত কলেজের অধিকারকে খর্ব করে।
বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাক্তনী মনে করে আগামী ১১ই জুন এর প্রস্তাবিত মূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার একতরফা সিদ্ধান্ত কলেজের সমস্ত প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীর আবেগকে আঘাত করেছে, আর তাই প্রাক্তনীর তরফ থেকে সম্পাদক প্রাক্তনী অনন্তমোহন সিনহা কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন যে সমস্ত প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের আবেগকে সঙ্গে নিয়ে চলা বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাক্তনী ভারাক্রান্ত মনে উক্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে অক্ষমতা প্রকাশ করছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্মৃতির প্রতি সম্পূর্ন শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং আমাদের প্রিয় কলেজের প্রতি চূড়ান্ত দায়বদ্ধ থেকেই এই অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণের অক্ষমতার জন্যে আমরা দুঃখিত।

36total visits,1visits today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *