সত্যি বলতে, রাজপুত্র ভাল নেই একটুও। শরীর অশক্ত হয়েছে, দরকার হচ্ছে নিয়মিত অক্সিজেনের

BUDDHADEB BHATTACHARYYA UNWELL

 

মদনমোহন সামন্ত,29 শে আগস্ট, কলকাতা:  রাজ্যে রেকর্ড গড়ে ইতিহাস হওয়া মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তখন সিংহাসনে আসীন থাকার শেষ লগ্নে। উত্তরসূরি খোঁজার কাজ চলেছে। যুবরাজ অপেক্ষা করছেন। এবার তাঁর পালা। নির্দিষ্ট সময়ে যুবরাজের অভিষেক হল। পশ্চিমবাংলায় কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে বড় লাল বাড়িটায়। যুবরাজ থেকে উত্তরণ হল তাঁর। সিংহাসনে বসে রাজপাট সামলানোর গুরুদায়িত্ব এবার তার কাঁধে। শিক্ষিত, মার্জিত, সুলেখক, সুবক্তা, শিল্প রসবোধসম্পন্ন, গৌরবর্ণ, সুঠাম চেহারার ধুতি-পাঞ্জাবি তিনি। নিপাট, নিভাঁজ, আদ্যন্ত শ্বেতশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বুক পকেট থেকে উঁকি মারে লেখনী। তিনি রাজ্যের নতুন রাজা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ‘পুরোহিত দর্পণ’-এর সঙ্কলক নেপাল ভট্টাচার্যের ঔরসে 1 মার্চ 1944 সালে ব্রিটিশ আমলের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কলকাতাতে পৃথিবীর আলো দেখা, যাদবপুর বিধানসভা ক্ষেত্রের 24 বছরের বিধায়ক, রাজ্যের সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী, সুযোগ্য, আদ্যন্ত কমিউনিস্ট পুত্র। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো। এহেন মানুষটি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পাম অ্যাভিনিউয়ের ছোট্ট ফ্ল্যাটে তাঁর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য এবং একমাত্র কন্যা সুচেতনাকে নিয়ে মাথা গুঁজেছিলেন। রাজ্যের পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব বাবুকে বড় ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিতে চাইলেও বুদ্ধদেব বাবু তা নেননি। 75 বছরে পা দিয়ে সর্বক্ষণ চিকিৎসকের নজরে থাকা এবং নানারকম শারীরিক অসুবিধা সত্ত্বেও ফ্ল্যাট ছেড়ে তিনি কোথাও যান নি। বহুদিন হয়েছে তাঁকে বাড়ির বাইরে বের হতে দেখেনি এলাকার লোকজন। চিকিৎসার প্রয়োজনে, নির্বাচনে ভোট দানের সময় এবং ব্রিগেড সমাবেশ থাকলে তবেই তিনি বাড়ির বাইরে বের হন। বাড়ির পাশেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করে থাকে তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্ব থাকাকালীন ব্যবহৃত বহু দিনের সারথি পক্ষীরাজ দুধ সাদা অ্যাম্ব্যাসাডরটি।সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে জীবনে প্রথমবার তিনি তাঁর নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মাঝে মাঝে তাঁকে গিয়ে দেখে এলেও রাজ্যের নবনিযুক্ত রাজ্যপাল জগদীপ ধনখর বুধবার বিকালে তাঁর বাড়িতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি আসতে চেয়েছিলেন বিকাল চারটার সময়। বুদ্ধদেব বাবুর পরিবার থেকে তাঁকে জানানো হয় পাঁচটা নাগাদ আসতে। অনুরোধ অনুরোধ রক্ষা করে সস্ত্রীক রাজ্যপাল পাম অ্যাভিনিউতে পৌঁছান। তাঁদের দু’জনকে অভ্যর্থনার জন্য আগে থেকেই মূল প্রবেশপথের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন বুদ্ধদেব বাবুর সহধর্মিনী মীরা ভট্টাচার্য। দু’জনে মুখোমুখি হতে পারস্পরিক নমস্কার বিনিময় করেন। এরপর বুদ্ধদেব বাবুর সঙ্গে ফ্ল্যাটের ভিতর দেখা করতে যাওয়ার আগে রাজ্যপাল মীরা দেবীর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেন। ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢুকে রাজ্যপাল দেখেন ঘর ভর্তি অজস্র বই এবং নানা রকম ওষুধ ঠাসা। সেসবের মধ্যে একদিকে হালকা বেগুনি শার্ট এবং সাদা পায়জামা পরে বুদ্ধদেব বাবু খাটে বসে রয়েছেন অতিথির অপেক্ষায়। দেওয়ালে রয়েছে তাঁর বাবা এবং মায়ের ছবি। রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার ছবি। রাজ্যপাল এগিয়ে যথোপযুক্ত সম্ভাষণ সেরে বুদ্ধদেব বাবুর সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করেন।

BUDDHADEB BHATTACHARYYA UNWELL

তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। বুদ্ধদেব বাবুর তখন মাথার পিছন হয়ে বাম কানের উপর দিয়ে বাম নাসাছিদ্রে লাগানো রয়েছে অক্সিজেনবাহী সরু নল। সেই দৃপ্ত ভাব আর নেই। মুখের হাসি বিলীন হয়েছে। মাথায় শুভ্র কোমল রেশমের মত পক্বকেশ ক্ষীয়মান হয়েছে। মুখমন্ডলের স্পষ্ট কালশিটে বর্ণ আভাস দিচ্ছে তাঁর প্রবল শ্বাসকষ্টের। ঘাড় উঁচিয়ে মুখ তুলে কথা বলার মত অবস্থা নেই। অশক্ত শরীরে কোনওরকমে টেনে টেনে কথা বলা। হাত ও হাতের আঙ্গুল, পা এবং পায়ের আঙ্গুল প্রয়োজনাতিরিক্ত ফোলাফোলা। আঙ্গুলের নখগুলি হলদেটে হয়ে আসা। সেই অবস্থাতেই খানিক বাক্যবিনিময় এবং তারপর ছোট্ট একটি চা-চক্র সেরে বৃষ্টিস্নাত বিকালে রাজ্যপাল বেরিয়ে আসেন বাইরে। সাংবাদিকদের কাছে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি বুদ্ধবাবুকে শ্রদ্ধা করেন। তাই তাঁর কাছে তিনি দেখা করতে এসেছেন। এর মধ্যে কোনওরকম রাজনৈতিক সূত্র খোঁজা বৃথা। সাংবাদিকরা বুদ্ধবাবুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে রাজ্যপাল সরাসরি কোনও উত্তর দেননি। তিনি কোনও উত্তর না দিলেও বুদ্ধবাবুর শারীরিক ভাষা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় যে, সত্যি বলতে, রাজপুত্র ভাল নেই একটুও!