কলকাতা: কলকাতা হাইকোর্টে (calcutta High Court) আজ সোমবার এক সরকারি আইনজীবীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা। বসিরহাট আদালতে বিচারককে হেনস্থা করার অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায়, আদালত কর্তৃক তলব করা সত্ত্বেও হাজির না হওয়া সরকারি আইনজীবী গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভর্ৎসনা করে বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ। বিষয়টি নিয়ে আজ কলকাতা হাইকোর্টে গুরুতর অবহেলা ও আইনজীবীর অশোভন আচরণ নিয়ে আলোচনা হয় এবং আদালত ওই আইনজীবীসহ ২১ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালত অবমাননার রুল জারি করেছে।
হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য:
ঘটনাটি ঘটে যখন সরকারি আইনজীবী গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় একটি পকসো মামলায় আদালতে উপস্থিত না থাকার কারণে অভিযুক্ত জামিন পেয়ে যান। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও, তিনি কেন মামলায় হাজির হননি, তা নিয়ে বিচারপতি ক্ষুব্ধ হন এবং প্রশ্ন করেন, “সংবিধানের ধারা কি শুধু দোষীদের রক্ষাকবচ দিতে? নির্যাতিতার কী হবে তখন?” এর পরই বিচারপতি আদালতের আচরণের প্রতি নিন্দা জানান।
বিচারপতি দেবাংশু বসাক আরও বলেন, “শেরিফকে কি ডেকে পাঠাব? গ্রেফতার করতে বলব?” এবং অভিযোগ করেন যে, এই ধরনের অদৃশ্য আচরণের কারণে, অভিযুক্তদের বিচার থেকে মুক্তি পাচ্ছে। বিচারপতি আরও বলেছিলেন, “এভাবে চলতে দেওয়া যায় না, একাধিক মামলায় এই আইনজীবীর অবহেলার ফলস্বরূপ অভিযুক্তরা ছাড় পেয়ে গেছে।”
নির্যাতিত শিশুদের অধিকার উপেক্ষিত:
একই দিনে, বিচারপতি দেবাংশু বসাক মন্তব্য করেন যে এই সরকারি আইনজীবীর কারণে নির্যাতিত শিশুদের উপযুক্ত বিচারপ্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিচারপতির ভাষ্য অনুযায়ী, “এভাবে বিচারপ্রক্রিয়া চলে না, আমাদেরও কোথাও উত্তর দিতে হয়।”
বিচারপতি এদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন, “এপিপি হিসেবে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাখা যাবে না, কারণ তাঁর এই ধরনের আচরণ আদালতের সঠিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।” বিচারপতি জানান, বসিরহাট আদালতে বর্তমানে এমন একজন এপিপি কাজ করছেন, যিনি মামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছেন না।
আইনজীবীর আচরণের কারণে ভর্ৎসনা:
এই ঘটনার পর, ৩০ বছর ধরে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করা গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রসঙ্গত, বর্ষীয়ান আইনজীবী জয়ন্ত মিত্র এই ঘটনায় মৃদু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “সরকারি আইনজীবীকে মাফ করে দিন।” তবে বিচারপতি বসাক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, “এভাবে চলতে দেওয়া যায় না, কারণ নির্যাতিত শিশুর জন্য সুবিচার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।”
কোর্ট অবমাননার রুল জারি:
আদালত ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করার পর, ২১ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আগামী ১৭ মার্চ পরবর্তী শুনানিতে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী এবং আদালতের মধ্যে তিক্ততার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এবং কলকাতা হাইকোর্টের এই তৎপরতার মাধ্যমে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে, মামলার সূত্রপাত হয় বসিরহাট আদালতে এক বিচারককে হেনস্থার অভিযোগে। ওই বিচারক, যিনি অভিযোগ করেছিলেন, কলকাতা হাইকোর্টে তার বিরুদ্ধে হওয়া ন্যায্য অভিযোগগুলো তুলে ধরেন। এই ঘটনায় বিচারপতি দেবাংশু বসাকের ডিভিশন বেঞ্চ মামলার শুনানি করে।
নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা:
একই সঙ্গে, বসিরহাট আদালত চত্বরে প্রায় কয়েক একর জমি রয়েছে যেখানে আলাদা আদালত প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবা হচ্ছে। বিচারপতি দেবাংশু বসাক বলেছেন, “এপিপি হিসেবে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার সঠিক মান নিশ্চিত করতে অক্ষম।”
এদিনের এই ঘটনায় এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে, যেখানে আদালতের প্রতি সরকারের দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তা এবং সরকারি আইনজীবীদের অভ্যন্তরীণ গাফিলতি নিয়ে আলোচনা চলছে।