ইকো পার্কে ঘুড়ি উৎসব ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ

কলকাতা তথা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র নিউটাউনের ইকো পার্ক। এই ইকো পার্ককে কেন্দ্র করেই বর্তমানে এক নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত ঘুড়ি উৎসব নিয়ে এবার প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ এবং বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা। এই উৎসবটি এমন এক সময়ে এবং এমন একটি স্থানে আয়োজন করা হয়েছে যা সরাসরি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিমান চলাচলের করিডোরের খুব কাছে। ফলে আকাশে ঘুড়ির আধিক্য এবং বিমানের যাতায়াত নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

কলকাতা বিমানবন্দরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মতে, বিমানবন্দরের আশেপাশে এই ধরনের ঘুড়ি ওড়ানোর অনুষ্ঠান বা উৎসব আয়োজন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ। কারণ, ঘুড়ি বা ঘুড়ির সুতো বিমানের ইঞ্জিনের ভেতরে ঢুকে গেলে বা বিমানের গায়ে আটকে গেলে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে, যখন কোনো বিমান অবতরণ বা উড্ডয়নের জন্য নিচে নেমে আসে বা উপরে ওঠে, তখন সামান্যতম বস্তুও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ইকো পার্ক বিমানবন্দরের মূল রানওয়ের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের প্রশাসনিক স্তরে এই বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এখনও পাওয়া যায়নি। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই আয়োজনের নিরাপত্তা নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে মুখ না খুললেও, তাঁর দলের নেতারা দাবি করেছেন যে জনস্বার্থ এবং যাত্রী নিরাপত্তার চেয়ে বড় উৎসব হতে পারে না। বিমানবন্দরের আকাশপথকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব মূলত এএআই বা এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার। অথচ, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের উৎসবের আয়োজন করায় আইন-শৃঙ্খলা এবং বিমান নিরাপত্তা আইনের পরিপন্থী কাজ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইকো পার্কের উন্মুক্ত চত্বরে উৎসাহী মানুষ ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। উৎসবের জাঁকজমক এবং জনসমাগম এতটাই বেশি যে, আকাশ জুড়ে রঙিন ঘুড়ির মেলা চোখে পড়ছে। কিন্তু সেই আকাশপথেই যখন একের পর এক যাত্রীবাহী বিমান যাতায়াত করছে, তখন আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক সচেতন নাগরিক সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন, উৎসব আনন্দের হওয়া উচিত, কিন্তু তা যেন কারোর নিরাপত্তার ঝুঁকি না হয়ে দাঁড়ায়। বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা এটিসি এই বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

উল্লেখ্য যে, অতীতেও বিমানবন্দরের কাছাকাছি অঞ্চলে ঘুড়ি বা ড্রোন ওড়ানোর মতো ঘটনার জন্য একাধিকবার কড়া পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে প্রশাসনকে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই উৎসব নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। আকাশপথের নিরাপত্তায় কোনো আপস করা উচিত নয় বলেই দাবি তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রকের কোনো নির্দেশিকা এসেছে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি এখনও পাওয়া যায়নি। উৎসবের আড়ালে যেন কোনো বড় ধরনের বিপদ না নেমে আসে, সেই কামনাই করছেন সাধারণ মানুষ। আগামী দিনে প্রশাসন এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক বা হিডকো কর্তৃপক্ষের তরফেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সরকারি উত্তর পাওয়া সম্ভব হয়নি। এই ঘুড়ি উৎসবকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।