জলপাইগুড়ি পুরবোর্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত খারিজ কলকাতা হাইকোর্টের

জলপাইগুড়ি পুরসভা নিয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের শাসকদল বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের করা মামলায় বড়সড় ধাক্কা খেল প্রশাসন। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আইনি নিয়ম বা বিধি না মেনে জলপাইগুড়ি পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পুরবোর্ডের কাজকর্ম পরিচালনার জন্য যে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল, তা-ও খারিজ করে দিয়েছে উচ্চ আদালত। এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর জলপাইগুড়ির পুরবোর্ড নিয়ে নতুন করে আইনি জট তৈরি হলো।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, জলপাইগুড়ি পুরসভা পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসকদলের তরফে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, তাকে বেআইনি বলে দাবি করে আদালতে দ্বারস্থ হয়েছিল বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস। আইনজীবীদের মতে, মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টের যথাযথ নিয়ম না মেনে যেভাবে একটি নির্বাচিত বোর্ডকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, তা অসাংবিধানিক। দীর্ঘ শুনানির পর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মাবলীর চরম লঙ্ঘন হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত বোর্ডকে এভাবে হঠকারী সিদ্ধান্তে সরিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রসঙ্গত, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকার এই পুরবোর্ডের বিলুপ্তি ও প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেছিল। অন্যদিকে, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তথা বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস শুরু থেকেই এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে সরব ছিল। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এবং পুরসভার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে বিজেপি সরকার এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। আদালতের এই নির্দেশে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিতে শাসকদল।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাকে পরিচালনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। সেই আইনকে পাশ কাটিয়ে একক কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। যে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল, তার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। এই নির্দেশনার ফলে জলপাইগুড়ির পুর-প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এখন দেখার বিষয়, রাজ্য প্রশাসন আদালতের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চতর কোনো বেঞ্চে আবেদন করে কি না।

বিরোধী দলনেতা তথা তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে এই রায়কে গণতন্ত্রের জয় বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, রাজ্যে বিজেপির অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আদালত বারংবার সরব হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে আশার আলো। অন্যদিকে, সরকারি আইনজীবীদের তরফে জানানো হয়েছে যে, আদালতের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে আপাতত আদালতের এই রায়ে জলপাইগুড়ি পুরসভার কাজকর্মের ওপর বড়সড় প্রভাব পড়তে চলেছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

উল্লেখ্য, জলপাইগুড়ির নাগরিকদের একাংশের মধ্যে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। পুরসভা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই এর আগে সরব হয়েছিলেন। উচ্চ আদালতের এই রায় সেই পরিষেবা স্বাভাবিক করার পথ প্রশস্ত করবে কি না, তা নিয়ে এখন নানা মহলে আলোচনা চলছে। এই মামলাটির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও পরবর্তী শুনানি সংক্রান্ত খবরের দিকে নজর রাখছে রাজ্যের সংবাদমাধ্যম। আদালতের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, পুরবোর্ড পুনর্গঠন বা পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানে উল্লিখিত নিয়মাবলি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। রাজ্য সরকারের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আইনি বেড়াজাল থেকে বের হওয়ার জন্য নতুন করে সঠিক আইনি পথ খোঁজা। এদিকে শহরবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষা যে এখন দীর্ঘায়িত হলো, তা বলাই বাহুল্য।