দুই দিনে দুবার আক্রান্ত তৃণমূল বিধায়ক, উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি

গত দুই দিনের ব্যবধানে দুবার বিধ্বংসী আক্রমণের মুখে পড়লেন রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের এক বিধায়ক। প্রকাশ্য রাজপথে একজন জনপ্রতিনিধির ওপর এমন নজিরবিহীন হামলার ঘটনায় গোটা রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের বর্তমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূলের মধ্যে বাদানুবাদ ও রাজনৈতিক তরজা এখন চরমে পৌঁছেছে। জানা গিয়েছে, আক্রান্ত বিধায়ক নিজের নির্বাচনী এলাকায় জনসংযোগের কাজ সেরে ফেরার পথেই দুষ্কৃতীদের সুপরিকল্পিত হামলার শিকার হন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক আক্রমণের প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার। বিধায়ক যখন তাঁর নিজস্ব গাড়িতে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন, সেই সময় একদল দুষ্কৃতী আচমকাই তাঁর গাড়ির গতি রোধ করে। অভিযোগ, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুষ্কৃতীরা লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। বিধায়ক অক্ষত থাকলেও তাঁর গাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আজ, শনিবার ফের একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে দুবার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় বিধায়কের নিরাপত্তা এবং রাজ্যের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে এই পরিকল্পিত আক্রমণের নেপথ্যে ঠিক কারা রয়েছে এবং কী কারণে এই হামলার ছক সাজানো হলো, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও তদন্তসাপেক্ষ।

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপির প্রত্যক্ষ মদতেই এই ধরণের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে। বিরোধী শিবিরের বিধায়কদের ভয় দেখিয়ে তাঁদের কণ্ঠরোধ করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব। অন্যদিকে, শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের পাল্টা দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ঘটনা নয়, বরং স্থানীয় কোনো ব্যক্তিগত বিবাদ বা এলাকার অভ্যন্তরীণ কোনো ঝামেলার জেরে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্তব্য আসলে পরিস্থিতির গুরুত্ব লঘু করার একটি অপচেষ্টা। রাজ্যের এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।

ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশি টহলদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিধায়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করার জন্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তরফ থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় মানুষজন এই ধরণের প্রকাশ্য গুন্ডাগিরির ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কিত। রাজপথে যখন একজন জনপ্রতিনিধিই সুরক্ষিত নন, তখন সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা কোথায়—এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনার পর থেকে গোটা এলাকার রাজনৈতিক তাপমাত্রা তুঙ্গে। আক্রান্ত বিধায়ক জানিয়েছেন, তিনি এই বিষয়ে স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত জোরকদমে শুরু হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে দুষ্কৃতীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে এই ঘটনার তদন্তভার বিশেষ তদন্তকারী দলের হাতে তুলে দেওয়ার কথাও ভাবছে প্রশাসন।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের খবর ক্রমাগত আসছে। বিরোধী দলনেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় রাজ্যপাল এবং নবান্নের মধ্যে প্রায়ই স্নায়ুযুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। আজকের এই ঘটনা সেই অস্থিরতাকে যেন আরও অনেক গুণ উসকে দিল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব রাজ্যের ওপর ন্যস্ত, সেই কাজে বর্তমান সরকার কতটা সফল, তা নিয়ে এখন জনমানসে এক বড়সড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, শীঘ্রই দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং এলাকায় শান্তি ফেরাতে সবরকম কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে বিধায়ক বা তাঁর দলের পক্ষ থেকে এই হামলার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নাম এখনো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সব মিলিয়ে রাজ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাজনীতির আঙিনায় এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে বিরোধী পক্ষ রাজ্যজুড়ে বড় আন্দোলনের ডাক দেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে।