পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা মালদা দীর্ঘকাল ধরেই মাদক চোরাচালানকারীদের করিডোর হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি এই জেলায় মাদক বিরোধী অভিযানে পুলিশ এক বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে, যা রাজ্যের অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে জেলা পুলিশের বিশেষ দল দুটি পৃথক সফল অভিযানে প্রায় তিন কেজি ব্রাউন সুগার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ মাদকের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য তিন কোটি টাকারও বেশি বলে প্রশাসনিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সফল অভিযানের প্রশংসা করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশের পেশাদারিত্ব ও তৎপরতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
পুলিশি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বেশ কিছুদিন ধরেই মালদা জেলার বিভিন্ন প্রান্তকে কেন্দ্র করে মাদক পাচারকারীদের একটি সক্রিয় চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। রাজ্যের বর্তমান সরকারের কঠোর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ এই চক্রের জাল ছিন্ন করতে নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। কয়েকদিনের নিরলস নজরদারির পর শুক্রবার পুলিশি দল পৃথক দুটি স্থানে অতর্কিত হানা দেয়। এই অভিযানের মাধ্যমে মোট পাঁচজন পাচারকারীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছে, তা রাজ্যের সাম্প্রতিক মাদক বিরোধী অভিযানের তালিকায় অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে যে, এই ধৃতরা মূলত একটি সুসংগঠিত আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। মালদাকে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট বা করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে তারা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই বিষাক্ত মাদক পৌঁছে দেওয়ার ছক কষেছিল। জেরায় ধৃতদের কাছ থেকে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে, যা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। এই চক্রের সাথে আর কোন কোন রাঘববোয়াল বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে পুলিশ এখন সচেষ্ট। ধৃতদের ইতিমধ্যেই আদালতে পেশ করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে যাতে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূল চক্রীদের শনাক্ত করা যায়।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রাজ্যের মাটি থেকে মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে সরকার কোনো আপস করবে না। যুবসমাজকে নেশার মারণ ছোবল থেকে রক্ষা করা বর্তমান প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। পুলিশ বাহিনীকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “মালদায় পুলিশ যে সাহসিকতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা রাজ্যের পুলিশ বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। মাদক চোরাচালান রুখতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নজরদারি আরও কয়েক গুণ বাড়ানো হচ্ছে। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আসতেই হবে।”
মালদার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঐতিহাসিকভাবেই এই জেলা চোরাচালানকারীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কুখ্যাতি রয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয়তায় এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিএসএফ-এর পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের সমান্তরাল নজরদারি অপরাধীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি নেশামুক্তি অভিযানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টা করছেন।
বর্তমানে পুলিশের এই বড় সাফল্যকে রাজ্যের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সাফল্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহল পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, এই চক্রের নেপথ্যে থাকা মূল মাথা কারা এবং মাদকের প্রকৃত উৎসস্থল কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন পুলিশের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তদন্তের মোড় কোন দিকে ঘোরে এবং এই অপরাধের জাল কতদূর বিস্তৃত, তা এখন দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো রাজ্যবাসী। পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ প্রমাণ করছে যে, রাজ্যে অপরাধের কোনো স্থান নেই এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চললে অপরাধীদের পতন অনিবার্য। এই অভিযান কেবল মাদক উদ্ধারের ঘটনা নয়, বরং এটি অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর হুঙ্কার হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।








