কলকাতার বুকে রাজনৈতিক কর্মসূচির ঢেউ আছড়ে পড়ল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রাঙ্গণে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভার দিন কার্যত স্তিমিত হয়ে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজকর্ম। বুধবার এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উপস্থিতির হার যেমন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তেমনই বাতিল করতে হয়েছে একাধিক নির্ধারিত ক্লাস। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক বিভাগ বাধ্য হয়ে অনলাইন ক্লাসের পথে হেঁটেছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
সকাল থেকেই যাদবপুর চত্বরে ভিড় ছিল অন্যরকম। গতানুগতিক ছন্দে চলা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এদিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। ক্যাম্পাসের অন্দরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক সমাবেশ। স্বভাবতই পড়ুয়াদের বড় অংশ উপস্থিত না হওয়ায় বহু শিক্ষক ক্লাসরুমে গিয়েও পঠনপাঠন শুরু করতে পারেননি। অনেক বিভাগের প্রধানরা জরুরি ভিত্তিতে নোটিশ দিয়ে আজকের ক্লাস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিছু অধ্যাপক জুম বা গুগল মিটের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অন্দরের খবর অনুযায়ী, শহরের যান চলাচল ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশনার কারণে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। অনেক পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বা লোকাল ট্রেন পরিষেবা ব্যবহার করে পৌঁছাতে পারেননি। যে সমস্ত পড়ুয়া দূরদূরান্ত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, তারাও আজকের দিনে ক্যাম্পাসে আসা থেকে বিরত থেকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তরফ থেকে অবশ্য কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্লাস বন্ধের ঘোষণা করা হয়নি, তবে কার্যত পরিস্থিতির চাপে পঠনপাঠনে ছেদ পড়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সাধারণ ঘটনা বলে দাবি করা হলেও, বিরোধী মহলের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর সভার প্রভাব সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ক্যাম্পাসের অন্দরে রাজনীতির ছোঁয়া লাগা নিয়ে বরাবরই সোচ্চার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আজ যেন রাজনীতির বাস্তব প্রভাব ক্লাসরুমের চৌকাঠে এসে ঠেকেছে। বেশ কিছু বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা জানিয়েছেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আজ না হওয়ায় সিলেবাস শেষ করা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাজ্য সরকার অর্থাৎ বিজেপি শাসিত প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছিল। এর জেরে শহরের মূল রাস্তাগুলোতে যান চলাচলের বিধিনিষেধ ছিল। এই বিধিনিষেধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সংবেদনশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ক্যাম্পাস সূত্রে খবর, যে সমস্ত ক্লাস অনলাইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাতেও উপস্থিতির হার ছিল খুবই নগণ্য। সার্বিক এই পরিস্থিতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজকর্মও ছিল ধীরগতির। আগামী দিনে এই ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালীন পঠনপাঠন কীভাবে সচল রাখা যায়, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বিভাগীয় প্রধানরা চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কতজন পড়ুয়া আজ অনুপস্থিত ছিলেন, সেই সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা পরিসংখ্যান এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলেও বর্তমান প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই ধরণের পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হতো। তবে বর্তমান শাসনে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, আজকের ঘটনা তা ফের একবার স্পষ্ট করে দিল। পড়ুয়াদের একাংশ মনে করছেন, পড়াশোনার ক্ষতি না করে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরের এই অচলাবস্থা কবে কাটবে এবং নিয়মিত ক্লাস কবে থেকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষক সংগঠনগুলো।








