বিশেষ প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় পালাবদলের পর এবার ভাঙন লোকসভাতেও। দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে খোদ রাজধানী দিল্লিতে বড়সড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটল। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদ একযোগে ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI) নামক একটি নিবন্ধিত আঞ্চলিক দলের সাথে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রবিবার (১৪ জুন, ২০২৬) নয়াদিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন বিদ্রোহী সাংসদেরা এবং এই মর্মে একটি চিঠিও জমা দেন। দলত্যাগ-বিরোধী আইনের (Anti-defection Law) কঠোর খাঁড়া থেকে বাঁচতেই তৃণমূলের মূল ব্লক থেকে বেরিয়ে এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
কেন ‘এনসিপিআই’-এর হাত ধরলেন বিদ্রোহীরা?
আইনি জটিলতা এড়াতে ভারতের সংবিধানের দলত্যাগ-বিরোধী আইনকে ঢাল করতে চাইছেন বিদ্রোহী সাংসদেরা। আইন অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি অন্য কোনো দলের সাথে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে দলত্যাগ করলেও কারো সদস্যপদ খারিজ বা অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি আসনে জয়ী হয়েছিল। তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বসিরহাটের সাংসদ হাজি শেখ নুরুল ইসলামের প্রয়াণের পর বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের মোট আসন সংখ্যা ২৮। আইন মোতাবেক দুই-তৃতীয়াংশের কোটা পূর্ণ করতে প্রয়োজন ১৯ জন সাংসদের সমর্থন। সেখানে ২০ জন সাংসদ এককাট্টা হওয়ায় স্পিকারের দরবারে তাঁরা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
স্পিকারের কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে রবিবারের বৈঠকে ১৯ জন সাংসদ সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। তবে বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, প্রবীণতম সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় শনিবারই (১৩ জুন) তাঁদের সাথে যোগ দেওয়ায় মোট সংখ্যাটি ২০-এ পৌঁছেছে।
‘দেশের স্বার্থে মোদী-এনডিএ-র সাথে কাজ করব’: কাকলি ঘোষ দস্তিদার
স্পিকার ওম বিড়লার সাথে বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ডঃ কাকলি ঘোষ দস্তিদার স্পষ্ট জানান: “আমরা লোকসভার স্পিকারের সাথে দেখা করে সংসদে বসার জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সাংসদ এবং আমরা ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’-র সাথে মিশে যাচ্ছি। দেশের স্বার্থে আমরা আগামীদিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং এনডিএ (NDA)-র সাথে একযোগে কাজ করব।”
জুলাইয়ে ‘তৃণমূল’ নামের দাবি জানাবেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপাতত একটি প্রায়-অজানা আঞ্চলিক দলের সাথে মিশে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেও, এর পেছনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন:
“নিয়ম অনুযায়ী, দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নিয়ে বেরিয়ে আসার প্রথম দিনেই সেই মূল দলের নাম দাবি করা যায় না। তাই আমরা আপাতত নিবন্ধিত আঞ্চলিক দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি’-র সাথে মিশে যাচ্ছি। তবে জুলাই মাসে যখন সংসদের অধিবেশন শুরু হবে, তখন আমাদের হাতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আমরা ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ হিসেবেই আমাদের গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাব। এরপর বাকিটা আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।”
ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই ‘এনসিপিআই’ (NCPI) দলটির নিবন্ধন হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে এবং এর প্রধান কার্যালয়টি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইলে অবস্থিত।
নেপথ্যে বিজেপি-যোগ? তুঙ্গে জল্পনা
তৃণমূলের এই বিশাল ভাঙনের পেছনে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির হাত রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রবিবার স্পিকারের বাসভবনে যাওয়ার আগে অধিকাংশ বিদ্রোহী সাংসদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে সমবেত হয়েছিলেন এবং সেখানে একটি বৈঠকও হয়। বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই লোকসভার সাংসদদের এই বড় অংশটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে আলাদা গোষ্ঠী তৈরির সলতে পাকাচ্ছিলেন, যা রবিবারে পূর্ণতা পেল।
পাল্টা কামড় মমতার, স্পিকারকে চিঠি অভিষেকের
বিদ্রোহী সাংসদেরা স্পিকারের ঘরে পৌঁছানোর আগেই আসরে নামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত শিবির। তৃণমূল নেত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত দুজন সাংসদ তড়িঘড়ি ওম বিড়লার সাথে দেখা করে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেন। লোকসভায় এআইটিসি (AITC)-র দলনেতা হিসেবে লেখা ওই চিঠিতে অভিষেক অনুরোধ করেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে যেন তার অনুমোদিত হুইপ ও নেতার প্রতিনিধিত্বাধীন একটি একক দল হিসেবেই গণ্য করা হয়।দলের কোনো তথাকথিত আলাদা গোষ্ঠী বা উপদলকে যেন কোনো রকম স্বীকৃতি, মর্যাদা বা আইনি সুবিধা প্রদান না করা হয়।
স্পিকারের তরফে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যেন অবশ্যই এআইটিসি (AITC)-র বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া হয়।
কার দিকে কতজন? একনজরে সংখ্যাতত্ত্ব
বর্তমানে ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে মাত্র ৮ জন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অনুগত রয়েছেন। তাঁরা হলেন— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, শত্রুঘ্ন সিনহা, প্রতিমা মণ্ডল এবং সাজদা আহমেদ। বাকি ২০ জনই এখন বিদ্রোহী শিবিরে।
উল্লেখ্য, লোকসভার এই বিদ্রোহের আগেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতেও বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে ঘাসফুল শিবির। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন, যিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিধানসভার পর এবার দেশের সংসদেও তৃণমূলের এই নজিরবিহীন ভাঙন বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিল।








