প্রণব বিশ্বাস,ভাটপাড়া : রাজ্যজুড়ে যখন লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী ময়নাতদন্তে ব্যস্ত ঘাসফুল শিবির, ঠিক তখনই ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের ভাটপাড়ায় শুরু হলো নতুন রাজনৈতিক মহাকাব্য। দলের জেলা নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় প্রমাণ অভিযোগ এবং একনায়কতন্ত্রের প্রতিবাদে এবার খোদ নিজের দলের বিরুদ্ধেই বিস্ফোরক ভাটপাড়া পৌরসভার উপ-পুরপ্রধান দেবজ্যোতি ঘোষ। তাঁর গলায় এখন তৃণমূলের উন্নয়নের ‘কঙ্কালসার’ চেহারার স্বীকারোক্তি আর দু’চোখে বিজেপি বিধায়কদের পরামর্শে চলার ইঙ্গিত।
অস্বস্তির কাঁটা যখন ঘরের ছেলে
রাজ্যের একাধিক জায়গায় তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরতেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। কিন্তু ভাটপাড়ার ছবিটা যেন আরও বেশি ঝাঁঝালো। উপ-পুরপ্রধান দেবজ্যোতি ঘোষের সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু দলের অস্বস্তি বাড়ায়নি, বরং ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দলকে রাজপথে এনে দাঁড় করিয়েছে। নিজের দলের বিরুদ্ধেই তাঁর তোপ— “কাজ করতে দেওয়া হয়নি।” আর এই ক্ষোভ থেকেই তিনি হাত মেলাতে চাইছেন বিরোধী শিবিরের দুই বিধায়কের সঙ্গে।
সোমনাথ শ্যামের বিরুদ্ধেই কি সব ক্ষোভ?
পরাজয়ের দায় কার? এই প্রশ্নে দেবজ্যোতিবাবুর নিশানায় সরাসরি জগদ্দলের প্রাক্তন বিধায়ক সোমনাথ শ্যাম ও তাঁর পরিবার। তাঁর দাবি, দলের হার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সোমনাথ শ্যাম ও তাঁর ভাইয়ের অতি-সক্রিয়তা এবং দাদাগিরির ফল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, নিচুতলার কর্মীদের গুরুত্ব না দিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখাই ডুবিয়েছে দলকে।
“উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে”
তৃণমূলের তথাকথিত উন্নয়নের দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে দেবজ্যোতি ঘোষ একপ্রকার বোমা ফাটিয়েছেন। তাঁর কথায়:
রাস্তা ও নিকাশি: দীর্ঘ তৃণমূল শাসনেও ভাটপাড়া-জগদ্দল এলাকায় রাস্তাঘাটের বেহাল দশা এবং নিকাশি ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
ক্ষমতাহীন পদ: উপ-পুরপ্রধান হয়েও তিনি ছিলেন কার্যত ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। উন্নয়নের কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর ছিল না বলে অভিযোগ।.
জনবিচ্ছিন্নতা: পরিষেবা না পেয়ে মানুষ মুখ ফিরিয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বক্সে।
বিজেপি প্রীতি না কি রাজনৈতিক সমীকরণ?
সবচেয়ে বিতর্কিত মোড়টি হলো বিজেপির দুই বিধায়কের প্রতি তাঁর সমর্থন। দেবজ্যোতি ঘোষ প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে হলে তিনি জগদ্দল ও ভাটপাড়ার দুই বিজেপি বিধায়কের পরামর্শ নিতেও পিছপা হবেন না। শাসক দলের এক হেভিওয়েট নেতার মুখ থেকে বিরোধী দলের বিধায়কদের প্রশংসা কার্যত নজিরবিহীন।
তবে,রাজ্য রাজনীতিতে যখন দলবদল এবং অন্তর্ঘাতের খেলা চলছে, তখন দেবজ্যোতি ঘোষের এই মন্তব্য ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে সোমনাথ শ্যাম শিবিরের পাল্টা হুঙ্কার, আর অন্যদিকে দেবজ্যোতির এই ‘বিদ্রোহ’—সব মিলিয়ে ভাটপাড়ার গঙ্গাপাড়ের রাজনীতি এখন উত্তপ্ত। এটি কি কেবলই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, না কি পদ্মবনে পা রাখার প্রথম ধাপ, তা নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে।








