সোমবার সকালে বিশ্ববাজার ভারতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর নিয়ে এসেছে। শেয়ার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দর ২১ পয়সা কমে সর্বকালের সর্বনিম্ন ৯৬.১৭-তে পৌঁছেছে। গত শুক্রবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রুপি ৯৬-এর মনস্তাত্ত্বিক স্তর অতিক্রম করেছিল এবং আজ এই দুর্বলতার ধারা আরও তীব্র হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে: রুপির দর কি এভাবেই কমতে থাকবে? ডলার কি সত্যিই ১০০ টাকায় পৌঁছাতে চলেছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রুপির এই পতন আপনার এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব ফেলবে? আসুন, এই পুরো হিসাবটা সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক।
পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্যে) চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যে রবিবার রাতে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়, যার পর আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা পুরোপুরি সংকটে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড (অপরিশোধিত তেল)-এর দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১১ ডলারে পৌঁছেছে।
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক অমীমাংসিত
বিশ্ব বাণিজ্যকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কোনো সুনির্দিষ্ট ফল দেয়নি। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং শক্তিশালী মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্যের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের মতো উদীয়মান বাজারগুলো থেকে তাদের তহবিল তুলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মার্কিন ডলারে বিনিয়োগ করছেন।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী
বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বের ব্যস্ততম তেল পথটিকে ব্যাহত করেছে। ভারত তার অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। যখন তেলের দাম বাড়ে, তখন তা কেনার জন্য ভারতকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ডলার দিতে হয়। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে, যা রুপিকে দুর্বল করে এবং ডলারকে শক্তিশালী করে।
ডলার কি ‘শতক’ ছুঁতে চলেছে?
শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনরেক্স ট্রেজারি অ্যাডভাইজার্সের বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিস্থিতি সত্যিই গুরুতর। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ না হয় এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দেওয়া হয়, তবে ডলারের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। যদি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়ানোর জন্য অবিলম্বে কোনো নতুন পরিকল্পনা বা প্রকল্প চালু না করে, তবে ১ ডলারের দাম শীঘ্রই ১০০ টাকায় পৌঁছে যেতে পারে।
সাধারণ মানুষের উপর এর প্রভাব কী হবে?
যখন রুপির মূল্য রেকর্ড পরিমাণে কমে যায়, তখন দেশের সাধারণ নাগরিককেই এর সরাসরি শিকার হতে হয়।
যানবাহন ও যাতায়াত আরও ব্যয়বহুল হবে: পেট্রোল ও ডিজেলের দাম (যা সম্প্রতি ৩ টাকা বেড়েছে) আরও বাড়তে পারে। পরিবহন খরচ বাড়ার সাথে সাথে ফল, শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে।
বিদেশে পড়াশোনা ও ভ্রমণ ব্যয়বহুল: আপনার সন্তান যদি বিদেশে পড়াশোনা করে অথবা আপনি যদি বিদেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে এখন আপনাকে কলেজের ফি এবং হোটেল বুকিংয়ের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারতীয় রুপি খরচ করতে হবে।
ইলেকট্রনিক্স সংকট: বিদেশ থেকে আমদানি করা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ বাড়বে, ফলে প্রযুক্তি গ্যাজেটগুলো আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যৎ করণীয়: সরকার ও আরবিআই এখন কী করবে?
ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে শক্তিশালী, কিন্তু অপরিশোধিত তেলের দাম ১১১ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি (বাণিজ্য ঘাটতি) আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায়, আরবিআই বাজারে ডলার বিক্রি করে রুপিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে। এছাড়াও, নাগরিকদের সোনা কেনা কমাতে এবং জ্বালানি সাশ্রয় করতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাম্প্রতিক আবেদন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।








