অন্তর্ধানে ‘যুবরাজ’! কর্মীদের বিপদে ফেলে কোথায় অভিষেক? শুভেন্দুর কাছে রাজনীতি শেখার পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ৪ জুনের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ১৫টা দিন। অথচ এখনও পর্যন্ত জনসমক্ষে দেখা মেলেনি তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে উঠতে শুরু করেছে তীব্র প্রশ্ন— ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায়?’

গণতন্ত্রে হার-জিত থাকবেই, কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর দলের এই কঠিন পরিস্থিতিতে একজন শীর্ষ নেতার এমন ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যাওয়া কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় হতে পারে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে যখন আগামী ২১ তারিখ ফলতার উপনির্বাচন, তখন সেখানে কার্যত ‘একলা চলো’ নীতিতে লড়তে হচ্ছে অভিষেকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাঁরই হাতে তৈরি নেতা জাহাঙ্গীর খানকে। ফলতার মাটিতে দাঁড়িয়ে জাহাঙ্গীর খান আজ কার্যত একাকী, ‘পুষ্পা’র মতো বিপদে পড়ে তাঁকে সুরক্ষার জন্য হাইকোর্ট পর্যন্ত ছুটতে হচ্ছে। অথচ এই চরম বিপদের দিনেও তাঁর পাশে নেই স্বয়ং ‘মেন্টর’।

উধাও ‘জিন্দাবাদ’ বাহিনী, বিপাকে লক্ষ লক্ষ কর্মী

ভোটের ফল বদলাতেই চেনা ছবিটাও উধাও। কদিন আগেও যাঁদের কাজ ছিল ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়া, গাড়ির দরজা খুলে ধরা কিংবা নেতার মাথায় যাতে চোট না লাগে তার জন্য হাত দিয়ে প্রটেকশন দেওয়া— সেই অতি-উত্সাহী অনুগামীদের এখন আর দূরবীন দিয়েও দেখা মিলছে না।

সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন সেই লক্ষ লক্ষ তৃণমূল কর্মী, যাঁরা ৪ জুনের আগে পর্যন্ত এই ‘যুবরাজে’র ওপর ভরসা করে রাজনীতি করেছিলেন, বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন। রাজ্যে এই মুহূর্তে মারাত্মক কোনো হিংসা না থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে এই কর্মীরা আজ চরম অসহায় ও অভিভাবকহীন। প্রশ্ন উঠছে, যাঁদের আপনি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করলেন, তাঁদের এই সংকটের দিনে আপনি নিজে কেন অন্তর্ধানে? কর্মীদের বিপদের দিনে যিনি পাশে থাকেন না, তিনি কেমন নেতা?

 ‘শুভেন্দুই ঠিক ছিলেন’— প্রমাণিত সত্য?

অভিষেকের এই অনুপস্থিতি কার্যত বিরোধী শিবিরের পুরোনো অভিযোগগুলোকেই ফের মান্যতা দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, তবে কি শুভেন্দু অধিকারীরাই ঠিক বলতেন? অভিষেক কি সত্যিই রাজনীতিতে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ নেতা? ২০১৪ সাল থেকে অধিকারী পরিবারের সঙ্গে যে রাজনৈতিক অন্যায় করা হয়েছে, তা আজ আর অভিষেক বা তাঁর ‘পিসি’ অস্বীকার করতে পারবেন না।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনেই আজ তুলনা চলছে রাজনৈতিক অলিন্দে। সেবার নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু ময়দান ছেড়ে পালাননি। নতমস্তকে প্রেস কনফারেন্স করে হার স্বীকার করেছিলেন, তারপর চরম সংঘাতের আবহেও আক্রান্ত দলীয় কর্মীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন, তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। আর আজ সেই লড়াইয়ের জোরেই তিনি বুক ফুলিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসছেন।

প্রতিহিংসার তত্ত্ব ও ‘রাজনীতি শেখার’ পরামর্শ

তৃণমূল শিবির থেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তোলা হলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। ক্ষমতা বদলাতেই অভিষেকের নিরাপত্তা কমেছে, ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস’ মামলার তদন্তের গতি বাড়ছে, এমনকি কেএমসি-র তরফে বাড়ির বিল্ডিং প্ল্যানও চেয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে বিরোধীদের এর চেয়েও বড় বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। শুভেন্দু অধিকারীও হয়েছেন।

তাই রাজনৈতিক মহলের স্পষ্ট দাবি— হার স্বীকার করে সামনে আসার সাহস না থাক, অন্তত কর্মীদের পাশে তো দাঁড়ান! বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরোধিতা করার আগে, তাঁর কাছ থেকে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা করে রাজনীতি শেখা উচিত অভিষেকের। আর সেই ‘রাজনীতির ক্লাসে’ একা নয়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উচিত নিজের ছায়াসঙ্গী প্রতীক জৈনকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া।

এখন দেখার, এই তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে কবে প্রকাশ্যে আসেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা, নাকি এই অন্তর্ধানেই সিলমোহর পড়বে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’র তকমায়।