নেপালের মৃতের সংখ্যা ১,২৫০-এ পৌঁছেছে, এখনও ৪,০০০-এরও বেশি মানুষ নিখোঁজ

নেপালের বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা এখন আর শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল বন্যায় গ্রাম, শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে প্রাণের সন্ধানে অক্লান্তভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে, কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলো এই ট্র্যাজেডির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। নিখোঁজদের একটি বড় অংশই বিদেশি নাগরিক, যা এই সংকটের পরিধিকে নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত করেছে।

মৃতের সংখ্যা বাড়ছে

গত ২৬শে আগস্ট আঘাত হানা বিধ্বংসী বন্যার পর নেপালের পরিস্থিতি এখনও সংকটপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জেলা থেকে মৃতদেহ উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে, এবং হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ।

নেপাল পুলিশ এবং জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) দেওয়া পরিসংখ্যান সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে, কারণ দুর্গম এলাকায় প্রবেশ এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশির সময় নতুন মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তাই, মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা ক্রমাগত হালনাগাদ করা হচ্ছে।

আটটি জেলায় সবচেয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ

বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে উঠে এসেছে চিতওয়ান। প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে ৩৪৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, এরপরেই রয়েছে নওয়ালপরাসি পূর্ব (২১৮টি), নওয়ালপরাসি পশ্চিম (২০৮টি) এবং নুয়াকোট (১৫৫টি)।

এছাড়াও, রাসুয়া থেকে ১২৭টি, গোর্খা থেকে ৬৯টি, ধাদিঙ থেকে ৬০টি এবং তানাহুন থেকে ৩৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস ও ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার অভিযানকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিপুল সংখ্যক বিদেশি সহ এখনও চার হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ

এই দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ থেকে ৪,৮৭৫-এর মধ্যে। পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই অব্যাহত রাখায়, প্রতিটি হালনাগাদে এই সংখ্যায় তারতম্য ঘটে।

নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। নেপাল সরকারের দেওয়া এক হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছিল যে, আনুমানিক ৫৯০ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন, যদিও পরবর্তী পরিসংখ্যানে এই সংখ্যাটি ৫৮৩ বলে জানানো হয়। এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশ থেকে নেপালে এসেছিলেন এবং বেশ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন।

১১,৯৯৩ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে

ভয়াবহ পরিস্থিতি সত্ত্বেও নেপাল সেনাবাহিনী, নেপাল পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী একটি ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত হেলিকপ্টার ও সড়কপথে ১১,৯৯৩ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এই অভিযানের জন্য প্রায় ২১,৩১৪ জন নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে ত্রাণ দলগুলো রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুনর্বাসন

নেপাল বর্তমানে তিনটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন: নিখোঁজদের সন্ধান, মৃতদের শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। হাজার হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা হারিয়েছেন।

ত্রাণ দলগুলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর সাথে সাথে মৃতের সংখ্যা ও নিখোঁজের পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি স্বল্পমেয়াদী ত্রাণ কার্যক্রম নয়। এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদী ত্রাণ, পুনর্গঠন এবং হিমালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে।