পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আসন্ন দুর্গাপূজার প্রাক্কালে রাজ্যের সমস্ত পুজো উদ্যোক্তাদের জন্য একগুচ্ছ নয়া নির্দেশিকা জারি করেছেন। সোমবার এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, পুজোর আয়োজনে কোনোভাবেই সনাতনী ঐতিহ্য, ধর্মীয় ভাবাবেগ বা বাঙালির চিরাচরিত সংস্কৃতির ওপর আঘাত করা যাবে না। তিনি উদ্যোক্তাদের বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, প্যান্ডেল নির্মাণ বা থিমের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রদর্শন যাতে না করা হয়, যা বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই নির্দেশ ঘিরে রাজ্যজুড়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ঐতিহ্যের প্রশ্নে নিজের আপসহীন অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, দুর্গাপূজা কেবল একটি উৎসব বা বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি বাঙালির আবেগ ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই থিমের নামে বাড়াবাড়ি, আকাশচুম্বী আড়ম্বর কিংবা মূল ধারার ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যাতে সংঘটিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে তিনি আয়োজকদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে অবশ্য এই বিধিনিষেধ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে ধরনের পুজো কার্নিভাল বা অতিরঞ্জিত আড়ম্বর দেখা যেত, এই নতুন সরকার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে পুজোর প্রকৃত গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিকতাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে, যা মুখ্যমন্ত্রীর আজকের বার্তায় অত্যন্ত পরিষ্কার।
চলতি বছরের দুর্গাপূজায় রাজ্য সরকারের তরফে বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্র মারফত জানা গেছে, প্রতিবারের মতো এবার আর জাঁকজমকপূর্ণ ‘ইমার্সন কার্নিভাল’ বা বিসর্জনের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে না। তার পরিবর্তে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রোডশো এবং স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মহালয়ার পুণ্যলগ্ন থেকেই রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যা বাঙালির ঐতিহ্যের পরম্পরাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে।
এছাড়া, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে মদ্যপান সংক্রান্ত বিধিনিষেধেও আমূল বদল আনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিন রাজ্যের সমস্ত মদের দোকান ও বার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। এই বিষয়ে কোনো প্রকার শৈথিল্য বা ছাড় দেওয়া হবে না বলে প্রশাসনিক কঠোরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। অষ্টমীর পবিত্র দিনে যাতে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা না ঘটে এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ ও নির্মল পরিবেশে মায়ের আরাধনায় মেতে উঠতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রশাসনিক প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পুজোর দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুজো উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, সনাতনী রীতি ও ঐতিহ্য মেনে সুষ্ঠুভাবে পূজা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার সব রকম সহযোগিতা করবে। তবে ঐতিহ্যের নামে কোনো ধরনের বিকৃতি বা অসংলগ্নতা বরদাস্ত করা হবে না বলে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পর পুজো কমিটিগুলি কীভাবে তাদের গতানুগতিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। ইতিমধ্যেই কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চলের অনেক বড় বাজেটের পুজো কমিটি মুখ্যমন্ত্রীর এই পরামর্শকে স্বাগত জানিয়েছে এবং নিজেদের থিম ও পরিকল্পনার রূপরেখা নতুন করে সাজাতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে এবারের শারদীয়া উৎসব হতে চলেছে ঐতিহ্য, ভক্তি এবং শৃঙ্খলার এক অনন্য মিশেল। সরকারি এই কড়াকড়ি এবং নতুন নির্দেশিকা যে রাজ্যবাসীর একাংশের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও গঠনমূলক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। আসন্ন উৎসবের দিনগুলোতে রাজ্যের সর্বত্র শান্তি বজায় রাখা এবং সরকারি বিধিনিষেধ কতটা কার্যকর হয়, তার দিকেই এখন নজর সকলের। সরকারের এই উদ্যোগ রাজ্যের সামাজিক পরিবেশকে আরও সুস্থ ও मर्याদাপূর্ণ করে তুলবে বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিকবৃন্দ।








