রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দীর্ঘদিনের দাবিকে এবার আরও জোরালোভাবে সমর্থন জানাল রাশিয়া। বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এই মত প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে এবং সেই পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ভারত।
সের্গেই লাভরভ এদিন বিশ্বজুড়ে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদ তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। এই প্রেক্ষিতে ভারতের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ভারতের মতো একটি দেশকে স্থায়ী সদস্যপদ দিলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্ব শান্তি বজায় রাখা অনেক বেশি সহজতর হবে। রাশিয়ার এই অবস্থান ভারত-রাশিয়া বন্ধুত্বের এক অনন্য নজির হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক স্তরে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষিতে তৈরি, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভারত তার বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসায় এই আসনের প্রধান দাবিদার। যদিও চীনসহ কয়েকটি দেশ বারবার এই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছে, কিন্তু রাশিয়ার এই সাম্প্রতিক সমর্থন ভারতের দাবিকে অনেকটাই শক্তিশালী করল বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় স্তরেও আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যের শাসক দল বিজেপির নেতারা রাশিয়ার এই ঘোষণাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখছেন। অন্যদিকে, রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও ভারতের বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা বৃদ্ধির এই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই স্বাগত জানানো হয়েছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ভারত আজ বিশ্বের দরবারে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। রাশিয়ার এই সমর্থন সেই সাফল্যেরই প্রতিফলন। প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অতীতে ভারতের বৈশ্বিক অবস্থানের উন্নতির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।
সের্গেই লাভরভ আরও জানান, রাশিয়ার বিদেশনীতিতে ভারতের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদারের স্থান অত্যন্ত উঁচুতে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি ভারত নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্ত হলে তা বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় নতুন অধ্যায় তৈরি করবে। রাশিয়ার এই সরাসরি অবস্থান ভারতের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বড় স্বস্তি। তবে এর জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদে বড় ধরনের সংশোধন প্রয়োজন এবং সে বিষয়ে আলোচনার দরজা খুলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য স্থায়ী সদস্যরা এই বিষয়ে কী অবস্থান গ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে পারলে তা কেবল ভারতের নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক গর্বের বিষয় হবে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ দমন, পরিবেশ রক্ষা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশের কণ্ঠস্বর অনেক বেশি জোরালোভাবে শোনা যাবে। রাশিয়া বরাবরই ভারতের পাশে থেকেছে, বিশেষ করে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে। এবার রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো উচ্চতর মঞ্চে রাশিয়ার এই সমর্থন নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই প্রক্রিয়ায় আরও অনেক কূটনৈতিক জলঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও রাশিয়ার মতো একটি ভেটো প্রদানকারী শক্তির সমর্থন পাওয়া ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক জয় হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
বর্তমানে ভারতের এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আমেরিকার মতো দেশগুলোও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে এই প্রস্তাব কতটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। রাশিয়ার পক্ষ থেকে গ্লোবাল সাউথকে প্রাধান্য দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা পরবর্তী বৈঠকের তারিখ সংক্রান্ত কোনো বিশেষ ঘোষণা এখনও রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে পাওয়া যায়নি। সবমিলিয়ে, বিশ্বমঞ্চে ভারতের স্থায়ী সদস্য হওয়ার স্বপ্ন এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে।







