কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে ২৫ শতাংশ নম্বর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্নাতক স্তরের পাঠক্রমে এক বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, এবার থেকে প্রতিটি বিষয়ের মোট নম্বরের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের (ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্ট) জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় শিক্ষানীতির রূপরেখাকে সামনে রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের কেবল পরীক্ষার খাতার নম্বরের ওপর ভিত্তি করে বিচার না করে, সারা বছর ধরে তাদের পড়াশোনা ও মেধার বিকাশের দিকে নজর রাখতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, প্রতিটি সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার পাশাপাশি এই অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের নম্বরের ভিত্তিতেই তৈরি হবে পড়ুয়াদের চূড়ান্ত রেজাল্ট। এতদিন পর্যন্ত এই মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন কলেজে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম চালু ছিল। এবার একটি নির্দিষ্ট খসড়া তৈরি করে সমস্ত অধীনস্থ কলেজের জন্য তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রজেক্ট ওয়ার্ক, ভাইভা এবং সেমিনার প্রেজেন্টেশনের ওপর ভিত্তি করে এই ২৫ শতাংশ নম্বর প্রদান করবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধ্যাপকরা।

এই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে পঠনপাঠনের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। এর ফলে পড়ুয়ারা যেমন সারা বছর পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তেমনই ক্লাসরুমে উপস্থিতির হারও বাড়বে। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই পড়ুয়াদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক পড়ুয়ার মতে, এই ব্যবস্থার ফলে পরীক্ষার চাপ কিছুটা কমলেও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের স্বচ্ছতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

রাজ্যের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। পশ্চিমবাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল, তার থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান শাসক দল বিজেপি শিক্ষা ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের দাবি জানাচ্ছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে অবশ্য এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, কোনো রকম আগাম আলোচনা ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে পড়ুয়াদের অনিশ্চয়তা বাড়বে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এই নিয়ম আগামী সেমিস্টার থেকেই কার্যকর হবে। কোন কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে কীভাবে এই মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশিকা কলেজগুলোর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কলেজের অধ্যক্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। যদি কোনো ছাত্রছাত্রী এই মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তুষ্ট হন, তবে তার জন্য কী ধরনের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকবে, সে বিষয়ে এখনো বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়নি।

শিক্ষামহলের একাংশের মতে, স্নাতক স্তরে এই ধরনের গঠনমূলক মূল্যায়নের প্রবর্তন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। সারা দেশে যে হারে সিবিসিএস এবং এনইপি কার্যকর হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই পথ বেছে নিয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সংখ্যক অধ্যাপক এবং পরিকাঠামো। অনেক কলেজে পরিকাঠামোর অভাবে এই মূল্যায়নের কাজ ঠিকমতো সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বৈঠকে এই বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর চূড়ান্ত সম্মতি মেলে। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই নিয়ম আগামী দিনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে কতটা সহায়ক হয়। সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের দ্রুত নতুন এই নিয়মাবলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।