উত্তরপাড়ায় হামলা: বিধায়ক কুণালের বাড়িতে গিয়ে বয়ান নিলেন তদন্তকারীরা

উত্তরপাড়ায় বিধায়কের ওপর হামলার ঘটনায় তদন্তের গতি বাড়াল পুলিশ। সোমবার বিকেলে বিধায়ক কুণাল ঘোষের উত্তরপাড়ার বাসভবনে পৌঁছান তদন্তকারী আধিকারিকরা। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। গত কয়েকদিন ধরেই উত্তরপাড়ার আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে সরব হয়েছেন শাসক দল বিজেপির নেতারা। এই আবহে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ওপর হামলার ঘটনা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

তদন্তকারী দল বিধায়কের বাড়িতে পৌঁছে বেশ কিছু সময় ধরে তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিধায়কের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী এবং সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে এলাকার রাস্তার মোড়ে থাকা ক্যামেরাগুলোর ওপর, যাতে দুষ্কৃতীদের গাড়ি বা পালানোর পথ চিহ্নিত করা যায়। তবে কারা এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে, তা নিয়ে এখনও স্পষ্টভাবে পুলিশের তরফে কিছু জানানো হয়নি। বিধায়ক কুণাল ঘোষ এই ঘটনায় সরাসরি বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের মদত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার পর উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না এবং দোষীরা যেই হোক, তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ মহল সূত্রে খবর, উত্তরপাড়ার এই ঘটনার পর এলাকায় পুলিশি টহলদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য জেলার শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের তুলনায় বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে শাসক দলের দাবি, কিন্তু বিরোধীরা এই দাবি মানতে নারাজ। তাদের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিক হিংসার নতুন নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত রবিবার রাতে। উত্তরপাড়ায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পর ফেরার পথে বিধায়কের গাড়ির ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। হামলায় গাড়ির কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং বিধায়কের নিরাপত্তারক্ষীরা অল্পের জন্য রক্ষা পান। হামলার ধরন দেখে মনে করা হচ্ছে এটি পরিকল্পিত ছিল। ঘটনার পরই স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা পথে নেমে বিক্ষোভ দেখান এবং দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সোচ্চার হন। সোমবার বিকেলে তদন্তকারীরা বিধায়কের বাড়িতে গিয়ে সবিস্তারে ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। বিধায়ক কুণাল ঘোষ সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে ফোনে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। পুলিশ এই অভিযোগের ভিত্তিতে একটি এফআইআর দায়ের করেছে এবং তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

তদন্তকারী দলের সদস্যরা বিধায়কের বাড়ির সদস্যদের থেকেও ঘটনার সময়কার মানসিক অবস্থার কথা জেনে নিয়েছেন। পুলিশের একটি বিশেষ দল উত্তরপাড়া থানার আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে। কল রেকর্ড এবং মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে কারা ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, তা বের করার চেষ্টা চলছে। এখনও পর্যন্ত সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের তরফে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, খুব শীঘ্রই দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো প্ররোচনায় পা না দিয়ে এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার বার্তাও দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বাংলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে সরকারি দাবি থাকলেও, মাঝে মাঝেই উত্তরপাড়ার মতো ঘটনা প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিরোধী দল তৃণমূলের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়েছে যে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ব্যর্থতা ঢাকতেই শাসক দল এই ঘটনাকে অহেতুক রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তৃণমূল নেতৃত্বের মতে, এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। সব মিলিয়ে, উত্তরপাড়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। পুলিশ জানিয়েছে যে, তারা প্রতিটি দিক খুঁটিয়ে দেখছে এবং কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি এর সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কাউকে রেয়াত করা হবে না। ঘটনার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর রয়েছে উত্তরপাড়াবাসীর। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, জনপ্রতিনিধিরাই যদি নিরাপদ না হন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? প্রশাসন এখন দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করতে পারে কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষায় রাজ্যবাসী।