মার্কিন ভিসার প্রতীক্ষায় হাঁসফাঁস ভারতীয়েরা, অপেক্ষা ৩৪৬ দিন পার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন এখন সাধারণ ভারতীয়দের কাছে দীর্ঘসূত্রতার এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হতে চাইছে না। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতীয় আবেদনকারীদের জন্য মার্কিন ভিসার সাক্ষাৎকার বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার গড় অপেক্ষার সময় ইতিমধ্যেই ৩৪৭ দিনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পড়ুয়া এবং ব্যবসায়িক মহলের একটি বড় অংশ। বিশ্বজুড়ে মার্কিন ভিসার চাহিদার তুলনায় পরিকাঠামোগত অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতাই এই দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্য ও সমীক্ষা অনুযায়ী, মার্কিন ভিসা পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকায় থাকা শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে ভারত বর্তমানে সপ্তম স্থানে রয়েছে। দীর্ঘ ৩৪৬ দিন বা তারও বেশি সময় ধরে বহু আবেদনকারী তাঁদের ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য অপেক্ষা করছেন। বিশেষ করে বি-১ (ব্যবসায়িক) এবং বি-২ (পর্যটন) ভিসার ক্ষেত্রে এই ঝঞ্ঝাট সবথেকে বেশি প্রকট। যারা জরুরি প্রয়োজনে বা চিকিৎসার জন্য আমেরিকা যেতে চাইছেন, তাঁরা সবথেকে বেশি অসহায় পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। দিনের পর দিন এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা কেবল ব্যক্তিগত পরিকল্পনাগুলোকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং দুই দেশের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানেও একপ্রকার নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি পরিস্থিতির পর্যালোচনা করা হয়, তবে দেখা যাচ্ছে যে, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর সরকার সামগ্রিক এই বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে ভিসা সংক্রান্ত সমস্যাগুলি যেভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল, তার থেকে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও আধুনিক ও দ্রুত সমাধানের দাবি তুলছে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি শাসিত এই রাজ্যেও ভিসার জটিলতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে কঠিন করে তুলেছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছেন যে, বর্তমান শাসক দল কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে সমস্যার সুরাহা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা অতিমারী পরবর্তী সময়ে মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কর্মী নিয়োগের সংকট এবং বিপুল পরিমাণ আবেদনের চাপে এই সিস্টেম কার্যত ভেঙে পড়েছে। যদিও মার্কিন বিদেশ দফতরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করছে এবং ইন্টারভিউ ছাড়াই ভিসা নবীকরণের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি চালু করেছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের জন্য এখনো অনলাইন পোর্টাল খুললে তারিখ পাওয়া সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে ভারত থেকে যে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদেরা। সময়মতো ভিসা না মেলায় বহু পড়ুয়া সেমিস্টার মিস করছেন, যা তাঁদের শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম। জরুরি ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আমেরিকা যেতে না পারায় ছোট ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও আলোচনার সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।

এই দীর্ঘসূত্রতার অবসানে ভারত সরকার ও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে কূটনৈতিক স্তরে আরও উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকেরা। ভারতীয় দূতাবাসগুলো বারবার মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এখনো পাওয়া যায়নি। ৩৪৭ দিনের এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়সীমা কবে নাগাদ কমবে, তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে, মার্কিন বিদেশ দফতরের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে এই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই দিন কাটাতে হবে। সব মিলিয়ে, মার্কিন ভিসার জন্য অপেক্ষারত প্রতিটি ভারতীয় এখন কেবল একটিই অপেক্ষায়, কবে এই দীর্ঘ প্রহর শেষ হবে এবং তাঁরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত মার্কিন ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের এই হয়রানি লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।