জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে বিদ্রূপ, ‘শোলে’র ঠাকুর বনাম ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইরান

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে ইরান বরাবরই তার স্বতন্ত্র এবং আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত। সাম্প্রতিককালে তেহরান যে কূটনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে, তা বিশ্বমঞ্চে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের কার্যকারিতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বজোড়া আধিপত্য এবং বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা নিয়ে ইরান যে সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ব্যঙ্গাত্মক মিমের মাধ্যমে ইরান বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার যে লড়াই বা ‘আর্ম গেম’-এর চিত্র তুলে ধরেছে, তা বর্তমানে নেটদুনিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের সাম্প্রতিকতম বিবৃতিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তেহরানের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাগামহীন হস্তক্ষেপকারী নীতি এবং এই বিষয়ে রাষ্ট্রসংঘের রহস্যময় নীরবতা সম্মিলিতভাবে বিশ্বশান্তির জন্য এক বিশাল সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বার্তাকে আরও কার্যকর এবং জনসাধারণের কাছে বোধগম্য করে তোলার জন্য ইরান সিনেমার জগতের জনপ্রিয় কিছু আইকনিক চরিত্রের সাহায্য নিয়েছে। বলিউডের কালজয়ী ব্লকবাস্টার ‘শোলে’ সিনেমার অবিস্মরণীয় চরিত্র ‘ঠাকুর’ এবং হলিউডের অতিপ্রাকৃত সুপারহিরো ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’-এর রেফারেন্স টেনে ইরান অত্যন্ত কৌশলে রাষ্ট্রসংঘের নিষ্ক্রিয়তার দিকে আঙুল তুলেছে। মিমটিতে দেখানো হয়েছে, বাস্তব পৃথিবীতে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ফলে বিভিন্ন দেশ জর্জরিত, তখন রাষ্ট্রসংঘ যেন কেবল একজন নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যাদের কোনো ক্ষমতা বা সদিচ্ছা নেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার।

তেহরানের স্পষ্ট অভিযোগ, তথাকথিত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর নিন্দা প্রস্তাব বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। ইরানের কূটনৈতিক মহলের দাবি, যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কোনো উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায়, তখন আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করা হয় না, যা বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ইরান বিশ্ববাসীর কাছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আহ্বান জানিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা আধিপত্যের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আওয়াজ তোলা অত্যন্ত জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, পপ-কালচারের জনপ্রিয় দৃশ্যকল্প ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই জটিল এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৌশলটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এই ধরনের ডিজিটাল প্রতিবাদের মাধ্যমে ইরান একদিকে যেমন নিজের দেশের ওপর ক্রমাগত চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষপাতদুষ্ট এবং দুর্বল আচরণের দিকেও সোজাসুজি আঙুল তুলেছে। যদিও রাষ্ট্রসংঘের তরফ থেকে এই বিশেষ মিম বা ইরানের দাবির প্রেক্ষিতে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে কূটনৈতিক মহলে এটি নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।

এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা সুনির্দিষ্ট কারণগুলো নিয়ে বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। এছাড়া তেহরানের এই তীব্র মন্তব্যের ফলে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো অবনতি ঘটবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তবে এটি অনস্বীকার্য যে, তেহরানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই মোড় বদল যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় যে, সরকার বা বিরোধী দলগুলো এই আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে খুব একটা মুখ খুলছে না। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্বেকার বিভিন্ন জমানায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অবস্থান গৃহীত হতো, বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতির নিরিখে তা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, ইরান যেভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বিদ্রূপের ছলে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, তা বর্তমান বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতিরই এক গভীর প্রতিফলন। যখন বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার লড়াই চলছে, তখন এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ রাজনৈতিক মহলে ঠিক কতটা প্রভাব বিস্তার করে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। রাষ্ট্রসংঘের এই তথাকথিত ‘আর্ম গেম’ বা পেশী প্রদর্শনের বিরুদ্ধে ইরানের এই অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী কোনো কূটনৈতিক সংকটের সূত্রপাত করে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ঘটনার পরবর্তী আপডেট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া মাত্রই সেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে। বিশ্ব রাজনীতিতে তেহরানের এই নতুন চাল সত্যিই কি কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে রয়েছে।