দক্ষিণ কলকাতার স্কুলে সহপাঠীর ধারালো অস্ত্রের কোপ, জখম নবম শ্রেণির ছাত্র

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুলে ঘটে যাওয়া একটি অনভিপ্রেত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় শহরজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। নবম শ্রেণির এক ছাত্রের ওপর তার সহপাঠীর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ সংঘাত নয়, বরং এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা এবং পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, একটি বই নিয়ে দুই সহপাঠীর মধ্যে বচসা তৈরি হয়। সামান্য সেই বিবাদ যে এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি শিক্ষক কিংবা অন্যান্য পড়ুয়ারা। ক্লাস চলাকালীন শ্রেণিকক্ষের মধ্যেই আচমকা অভিযুক্ত ছাত্রটি তার সহপাঠীর ওপর চড়াও হয় এবং সঙ্গে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গলায় ও হাতে আঘাত করে। আকস্মিক এই হামলায় শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ছাত্রের গলা থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে দেখে শিক্ষকরা দ্রুত পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেন।

গুরুতর জখম অবস্থায় ওই ছাত্রটিকে তড়িঘড়ি দক্ষিণ কলকাতার রুবি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের টেবিলে পাঠান। দীর্ঘ সময়ের অস্ত্রোপচার শেষে বর্তমানে শিশুটির অবস্থা স্থিতিশীল হলেও চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাকে রাখা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ক্ষত বেশ গভীর ছিল, তবে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করায় সে বর্তমানে বিপদমুক্ত।

স্কুলের ভেতরে একটি শিশু কীভাবে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঢুকল, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে। স্কুলের নিরাপত্তার কড়াকড়ি সত্ত্বেও এমন অস্ত্রশস্ত্র পড়ুয়ার ব্যাগে থাকাটা নিরাপত্তার এক বড় ফাঁকফোকর বলেই মনে করছে সচেতন মহল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং আক্রান্ত ছাত্রের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, ওই পড়ুয়ার মানসিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সামনে আসার পর অভিভাবক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অনেক অভিভাবকের দাবি, স্কুলগুলোতে পড়ুয়াদের ব্যাগ নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়াশোনার যে বিপুল চাপ, তার ফলে অনেক সময় তাদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন সময় নির্দেশিকা জারি করা হলেও খোদ কলকাতার একটি অভিজাত স্কুলে এই ধরণের হিংসাত্মক ঘটনা প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শাসক ও বিরোধী দলের অবস্থানের মধ্যে এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়কালের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনে অনেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়ার দাবি তুলেছেন।

পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং ঘটনার সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত ছাত্রটি কেন এবং কীভাবে এমন হিংসাত্মক পথ বেছে নিল, তার নেপথ্যে কোনো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতাভুক্ত। ঘটনার পরবর্তী সময়ে এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। আগামী দিনে স্কুলে পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত সামগ্রী পরীক্ষার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মাবলী প্রণয়ন করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সাউথ পয়েন্টের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরণের ঘটনা ভবিষ্যতে আর যাতে না ঘটে, তার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসন উভয়কেই এখন কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখন পুলিশের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে শহরবাসী এবং অভিভাবকদের মধ্যে যে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা দূর করা এখন সময়ের অপেক্ষা।