কলকাতার ফুটবল প্রেমীদের রক্তে এখন ব্রাজিলীয় ফুটবলের ছন্দ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নীল-সাদা বনাম হলুদ জার্সির দ্বৈরথ দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো মহানগরী। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় ক্লাবগুলোর আড্ডায় এখন কেবলই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই আসন্ন ম্যাচ। যদিও বিশ্বকাপের উত্তাপ এখনো অনেকটা দূরে, কিন্তু প্রীতি ম্যাচ বা বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের আমেজেই তিলোত্তমা সেজে উঠেছে হলুদ আর নীল রঙে। শহরবাসী যেন এক মধুর সংকটে পড়েছেন—কার সমর্থনে গলা ফাটাবেন, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় কোনো খামতি নেই।
শহরের বিভিন্ন বাজারে এখন ব্রাজিলীয় জার্সির বিপুল চাহিদা। দোকানিরা জানাচ্ছেন, গত কয়েকদিনে হলুদ জার্সির বিক্রি আকাশছোঁয়া। ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর মাঠের বাইরে এখন সাম্বা ছন্দের আবহ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে শুরু করে পার্ক স্ট্রিট, সবখানেই এখন ফুটবলপ্রেমীদের ভিড়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ব্রাজিলীয় স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। তরুণ প্রজন্মের কাছে নেইমার বা ভিনিসিয়াসরা যেন ঘরের ছেলে। তাদের গোল করার ভঙ্গি থেকে শুরু করে ড্রিবলিং, সবই এখন কলকাতার তরুণ তুর্কিদের নখদর্পণে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামো নিয়ে বরাবরই আশাবাদী। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কলকাতার ফুটবল উন্মাদনা সারা বিশ্বের কাছে এক নিদর্শন। তাঁর মতে, খেলাধুলার প্রসারে বর্তমান সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে করে ভবিষ্যতে এমন অনেক বড় ম্যাচের সাক্ষী থাকবে এই শহর। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখনও কলকাতার ফুটবল ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। বিজেপি শাসিত এই রাজ্যে ফুটবলের জনপ্রিয়তা যে এতটুকু কমেনি, তা আবারও প্রমাণ করছে এই ফুটবল উন্মাদনা। তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য অভিযোগ তুলেছে যে, বড় ম্যাচের আয়োজন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ঢিলেমি রয়েছে। তবে রাজনীতি ছাপিয়ে মাঠে এখন বল গড়ালেই হলো—এমনটাই মনে করছেন আম ফুটবলপ্রেমীরা।
শহরের নামী রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ক্যাফেগুলোও পিছিয়ে নেই। বড় পর্দায় খেলা দেখানোর জন্য বিশেষ ஏற்பாடு করা হয়েছে। মেনুতেও থাকছে ব্রাজিলীয় ফিউশন খাবারের স্বাদ। অনেকে আবার হলুদ রঙের বিশেষ কেক বা মিষ্টি বানিয়ে নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করছেন। বয়োজ্যেষ্ঠ ফুটবল অনুরাগীদের মতে, আটের দশকের ফুটবলের উন্মাদনা আজও ম্লান হয়নি, বরং তা আরও বেড়েছে। তখনকার দিনে টেলিভিশন ছিল একমাত্র ভরসা, এখন ডিজিটাল মিডিয়ার দৌলতে প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট নিমেষের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে হাতের মুঠোয়।
নিরাপত্তার দিক থেকে কলকাতা পুলিশও যথেষ্ট তৎপর। বড় জমায়েত ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিশেষ রুট ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে গড়ের মাঠ ও সংলগ্ন এলাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করার কথা ভাবা হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর নজর রাখছে লালবাজার। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ফুটবল ভক্তদের উচ্ছ্বাসকে কেন্দ্র করে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ফুটবলের প্রতি শহরের মানুষের ঐকান্তিক টান। ব্রাজিল ম্যাচে কে জিতবে, আর কে হারবে, সেই হিসেব এখন তুচ্ছ। জয় হোক সুন্দর ফুটবলের—এই বার্তাই এখন ধ্বনিত হচ্ছে কলকাতার বাতাসে।
ম্যাচ শুরুর আগে প্রতিটি মুহূর্ত যেন উৎসবের মতো। মানুষ এখন তাদের ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে একটু আনন্দ খুঁজে নিতে চায় এই ফুটবলীয় আবহে। পরিবারের ছোট সদস্য থেকে বাড়ির বয়স্ক সদস্য, সকলেই এখন শামিল এই উৎসবে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের পাতায় ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ যেন বাঁধনহারা। কেউ কেউ আবার নীল-সাদা এবং হলুদ জার্সির সংমিশ্রণে তৈরি বিশেষ পতাকা উড়িয়ে নিজেদের আবেগ প্রদর্শন করছেন। সব মিলিয়ে কলকাতা এখন এক বিশাল ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। ম্যাচ শেষের পর ফলাফল যাই হোক না কেন, ফুটবলপ্রেমী কলকাতার হৃদয়ে এই দিনটি দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে। ব্রাজিলীয় ম্যাজিক দেখার অপেক্ষায় পুরো শহর।








