রাজ্যের সমস্ত স্কুলে পানীয় জলের গুণমান পরীক্ষার নির্দেশ সরকারের

রাজ্যের প্রতিটি সরকারি এবং সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করতে এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিল রাজ্য সরকার। সাম্প্রতিক এক সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার বিষয়টিই বর্তমান প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের প্রশাসনিক নির্দেশে শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত বিস্তারিত এবং কার্যকর রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যালয়ের পানীয় জলের বিশুদ্ধতা এবং গুণমান নিয়ে অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছিল, এই নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা অনেকটাই প্রশমিত হবে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের দক্ষ আধিকারিকদের সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জলের নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে তার বিশদ রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট ব্লক অফিসে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জলের নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে, তা নিয়েও নির্দেশিকায় বিস্তারিত ও স্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে। আর্সেনিক, আয়রন এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখাই হবে এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে জল প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও, বর্তমান বিজেপি সরকারের অধীনে এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে পানীয় জলের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশিকায় আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো বিদ্যালয়ের জলের নমুনা পরীক্ষার পর দেখা যায় যে তা পান করার উপযুক্ত নয়, তবে কালবিলম্ব না করে সেই জলের উৎস বা কল দ্রুত মেরামত করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন গভীর নলকূপ বসানোর ব্যবস্থাও করবে স্থানীয় প্রশাসন। বিদ্যালয় পরিচালন সমিতি এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের এই পুরো প্রক্রিয়ায় তদারকি করার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জলের গুণমান সংক্রান্ত নিয়মিত রিপোর্ট জেলা শিক্ষা দপ্তরে পৌঁছানো এখন থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবশ্য এই উদ্যোগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে সরকারি মুখপাত্রের দাবি, পড়ুয়াদের সুরক্ষার প্রশ্নে সরকার কোনোভাবেই আপস করবে না। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্যের সমস্ত স্কুলের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কোনো স্কুল যদি নিয়ম মেনে জলের গুণমান পরীক্ষার এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারিও প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের সব ব্লকেই এই পরীক্ষা প্রক্রিয়া একযোগে শুরু করার জন্য জেলাশাসকদের ইতিমধ্যে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিলের রান্নায় যে জল ব্যবহৃত হয়, সেই জলের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করাও এই বৃহত্তর কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

সরকারি তথ্যানুযায়ী, বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে ভূগর্ভস্থ জলে আয়রন এবং অন্যান্য খনিজের আধিক্য তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। সেই কারণেই এই জেলাগুলিতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত জল পান করার ফলে শিশুদের পেটের অসুখ, টাইফয়েড এবং অন্যান্য জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সেই ঝুঁকি কমাতেই বর্তমান সরকার এই সময়োপযোগী এবং সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কোনো নির্দিষ্ট স্কুলের জলের উৎস নিয়ে যদি কোনো স্থানীয় অভিযোগ থাকে, তবে তা দ্রুত জানানোর জন্য বিশেষ হেল্পলাইন নম্বরও চালু করা হতে পারে বলে সরকারি সূত্রের খবর। এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিকাঠামো কতটা উন্নত করা সম্ভব হয়, তা নিয়েই এখন রাজ্যজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে। সামগ্রিকভাবে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য এবং সংকল্প। বিদ্যালয়গুলোর পরিকাঠামো সংস্কারের এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের হাজার হাজার পড়ুয়া উপকৃত হবে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।