দেশভাগের ক্ষত আজও দগদগে। ইতিহাসের পাতায় সেই বিচ্ছেদের আটটি দশক পেরিয়ে গেলেও হৃদয়ের অমোঘ টান এতটুকুও ফিকে হয়ে যায়নি। ওপার বাংলার খুলনার বাসিন্দা এক বৃদ্ধা বহু চেষ্টার পর শেষপর্যন্ত খুঁজে পেলেন নদিয়ার কৃষ্ণনগরে থাকা তাঁর আপন আত্মীয়দের। দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর এই পুনর্মিলনের খবরে আবেগে ভাসছেন দুই প্রান্তের মানুষ। খুলনার বাসিন্দা এই বৃদ্ধা এখন স্বপ্ন দেখছেন, আসন্ন শারদীয়া দুর্গোৎসবে পরিবারের সকলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার।
দীর্ঘ আট দশকের ব্যবধান। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের অভিশপ্ত সময়ে অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে চলে এসেছিলেন, আবার অনেকে রয়ে গিয়েছিলেন ওপারে। সময়ের স্রোতে সেই সব পরিবার একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দশকের পর দশক পার হয়েছে, চিঠিপত্র আদান-প্রদান বন্ধ হয়েছে, হারিয়ে গেছে যোগাযোগের চিরাচরিত সূত্র। কিন্তু রক্তের বাঁধন তো মিথ্যে হতে পারে না। সেই নাড়ির টানেই বৃদ্ধা তাঁর হারিয়ে যাওয়া ভাইবোন ও পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে শুরু করেছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌলতে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত ঠিকানার সন্ধান পেলেন তিনি।
কৃষ্ণনগরের ওই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হওয়ার পর যেন আবেগের বাঁধ ভেঙেছে। ফোনের ওপারে প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শুনে দুপক্ষই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। বৃদ্ধা জানিয়েছেন, শৈশবের সেই হারানো দিনগুলো আবার ফিরে পাওয়ার আকুতি তাঁর মধ্যে তীব্র। দেশভাগের ফলে যে ভৌগোলিক ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা যেন এবার ঘুচতে চলেছে। তিনি জানিয়েছেন, শারীরিক অসুস্থতা এবং বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা থাকলেও মনের জোরে তিনি কৃষ্ণনগরে আসতে আগ্রহী।
এই মুহূর্তে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে নানা ব্যস্ততা থাকলেও, সাধারণ মানুষের এই আবেগের খবর গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বাংলার সংস্কৃতিমনস্ক মানুষকে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমান্ত বা ওপার বাংলার মানুষদের সঙ্গে আবেগপূর্ণ সংযোগের বিষয়ে ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রয়েছে। অতীতে এই ধরনের বিষয়গুলো বহু ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত ছিল বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশও এই মানবিক মেলবন্ধনের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে উৎসাহী।
কৃষ্ণনগরের ওই পরিবারও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাঁদের খুলনার দিদির জন্য। আশি বছর পর এই মিলন কেবল দুটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়, এটি যেন ইতিহাসের এক টুকরো জয়। বৃদ্ধা জানিয়েছেন, শারদীয়া দুর্গোৎসবের সময় তিনি কৃষ্ণনগরে এসে আত্মীয়দের সঙ্গে নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে চান। ছোটবেলার সেই উৎসবের স্মৃতি আজও তাঁর মানসপটে অমলিন। বর্তমানে পাসপোর্ট এবং ভিসার জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আইনি ও প্রশাসনিক সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে। দুই দেশের প্রশাসনিক সহযোগিতা মিললে হয়তো আসন্ন পুজোর মরসুমেই এই মাহেন্দ্রক্ষণ সম্পন্ন হবে।
সীমান্তের কাঁটাতার কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা হয়েই থেকে গেছে, কিন্তু হৃদয়ের টান যে আট দশকেও ম্লান হয়নি, তা এই ঘটনা ফের প্রমাণ করল। বৃদ্ধার এই অদম্য জেদ এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে সাহায্য করেছেন অনেকেই। সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য ও প্রশংসনীয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই কাহিনী ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
খুলনা থেকে কৃষ্ণনগরের এই যাত্রা দীর্ঘ পথের হলেও, মনের মিলনের ইচ্ছার কাছে দূরত্ব আজ তুচ্ছ। আশি বছর পর এই পুজোয় কি তবে সত্যিই এক হবে দুই বাংলা? এই প্রশ্নই এখন কৃষ্ণনগর থেকে খুলনা—সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। বৃদ্ধার পরিবার আশাবাদী, দীর্ঘদিনের এই বিচ্ছেদ এবার পূর্ণতা পাবে আনন্দের মিলন উৎসবে।
মানুষের আবেগের দাম কি রাজনীতির সীমানা দিয়ে মাপা সম্ভব? এই প্রশ্নই আজ বারবার সামনে আসছে। দেশভাগ হয়তো মানচিত্রকে বদলে দিয়েছিল, দুই দেশের মানুষের নাগরিকত্ব বদলে দিয়েছিল, কিন্তু সেই সময়ের মানুষগুলোর স্মৃতি ও ভালোবাসার ওপর কোনো দেশের সীমানা প্রাচীর তৈরি করতে পারেনি। বৃদ্ধার এই লড়াই প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা এবং আত্মীয়তার বাঁধন সময়ের কাঁটাতারকে তুচ্ছ করার ক্ষমতা রাখে। যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে এবারের শারদীয়া দুর্গোৎসব কৃষ্ণনগরের এক পরিবারে বয়ে আনবে এক নতুন দিগন্ত। সেই মিলনমেলায় হয়তো ধ্বনিত হবে হারিয়ে যাওয়া অগণিত মানুষের না বলা কথা আর চোখের জলের নোনা স্বাদ।
পরিশেষে বলা যায়, এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি হলো এক মানবিক দলিল। যারা আজও ওপার বাংলায় আপনজনদের কথা ভেবে চোখের কোণে জল জমান, তাঁদের কাছে এটি এক নতুন আশার আলো। বৃদ্ধার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং শেষপর্যন্ত আত্মীয়দের খুঁজে পাওয়ার ঘটনা বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। দুই বাংলার মানুষের এই আন্তরিক চাওয়া যেন সফল হয়, এটাই আজ কোটি মানুষের প্রার্থনা। সেই কাঙ্ক্ষিত পুজোর অপেক্ষায় দিন গুনছে কৃষ্ণনগরের পরিবারটিও।








