ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথে পার্ক স্ট্রিট, প্রথমবার দুর্গাপুজো অ্যালেন পার

কলকাতার হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত পার্ক স্ট্রিট, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বড়দিনের উৎসব, কেক, প্যাস্ট্রি এবং আলোকসজ্জার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, এবার সেই চিরচেনা রূপের বাইরে এক নতুন পালক যোগ করতে চলেছে। ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লিখে এই প্রথমবার পার্ক স্ট্রিটের বুক চিরে শারদীয়া দুর্গাপূজার শঙ্খধ্বনি শোনা যাবে। ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই রাস্তাটি এতদিন মূলত পশ্চিমী সংস্কৃতির মিশেলে বড়দিন ও নববর্ষের উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এবার মা দুর্গার আগমনে সেখানে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনের আবহ তৈরি হয়েছে, যা শহরবাসীকে উপহার দিতে চলেছে এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার।

অ্যালেন পার্ক চত্বরে আয়োজিত হতে যাওয়া এই দুর্গাপূজার মূল সুরটি হলো বাঙালির হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য এবং সনাতনী রীতিনীতির সার্থক উদযাপন। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পুজোর চার-পাঁচটি দিন পার্ক স্ট্রিটের এই বিশেষ স্থানটিতে এক ভিন্নধর্মী উৎসবের আমেজ বজায় থাকবে। এটি কেবল প্রতিমা দর্শন বা ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাঙালির লোকসংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরার এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠবে এই মণ্ডপ। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণের গান—বাউল সংগীতের আসর। এমন এক আন্তর্জাতিক মানের রাস্তায় শারদীয়ার আরাধনা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই উৎসাহের পারদ তুঙ্গে।

রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আয়োজনের নিরাপত্তা এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। পার্ক স্ট্রিটের মতো অত্যন্ত ব্যস্ত এবং সংবেদনশীল এলাকায় দুর্গাপূজার আয়োজন করা প্রশাসনিক দিক থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বড়দিন বা শীতকালীন উৎসবের সময় এখানে যে হারে জনসমাগম হয়, দুর্গোৎসবের দিনগুলোতেও সেই একই রকম বা তার চেয়েও বেশি ভিড় হতে পারে বলে ধারণা করছে প্রশাসনিক মহল। সেই প্রেক্ষিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই একটি সুপরিকল্পিত ব্লুপ্রিন্ট তৈরির কাজ জোরকদমে চলছে। উৎসবের দিনগুলিতে যাতে নিত্যযাত্রীদের কোনো অসুবিধায় পড়তে না হয়, সেজন্য রুট ম্যাপে বড়সড় পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট ক্রসিং এবং সংলগ্ন এলাকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক গাইডলাইন তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

আয়োজকরা স্থানীয় প্রশাসন এবং কলকাতা পুলিশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন যাতে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো খামতি না থাকে। এই উদ্যোগটি কেবল ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবের গণ্ডিতে আটকে নেই, বরং এটি কলকাতার সার্বজনীন সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় কলকাতায় পুজোর যে আন্তর্জাতিকীকরণ শুরু হয়েছিল, তা যে আজও সমান গুরুত্বের সাথে এগিয়ে চলেছে, তা এই নতুন আয়োজনেই স্পষ্ট। বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং শাসক দল—উভয় পক্ষই এই উদ্যোগকে কলকাতার সাংস্কৃতিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে এই পুজোর আয়োজন শহরের সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল হিসেবে পরিগণিত হবে বলে আশাবাদী আয়োজক কমিটি।

বর্তমানে অ্যালেন পার্কে পুজোর মণ্ডপ নির্মাণ এবং আলোকসজ্জার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। প্রযুক্তির সাথে ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে কেমন হবে এই মণ্ডপ, তা নিয়ে শহরজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে। পুজোর দিনগুলিতে পার্ক স্ট্রিটের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও দর্শনার্থীদের অগণিত ভিড় সামলাতে কত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হবে, তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে রাজ্য সরকার এবং কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে জানানো হয়েছে যে, উৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো রকম আপস করা হবে না। প্রতিটি মোড়ে বসানো হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ভিড় সামলাতে থাকছে বিশেষ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। সব মিলিয়ে পার্ক স্ট্রিটের এই নতুন সংযোজন শহরবাসীর কাছে শারদীয়া উদযাপনে এক বাড়তি উন্মাদনা ও আনন্দের বার্তা বয়ে আনবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই নতুন পথচলা কলকাতার উৎসবের ক্যালেন্ডারে এক মাইলফলক হিসেবে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।