নিউ টাউনে অবৈধ বাণিজ্যিক ব্যবহার, ৩৮টি বহুতল চিহ্নিত করল এনকেডিএ

নিউ টাউন কলকাতা উন্নয়ন পর্ষদ বা এনকেডিএ (NKDA) সম্প্রতি শহরের বুকে গড়ে ওঠা অবৈধ বাণিজ্যিক কাঠামোগুলোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পরিকল্পিত এই উপনগরীর সামগ্রিক পরিকাঠামো বজায় রাখা এবং নাগরিক পরিষেবা উন্নত করার লক্ষ্যে পর্ষদ এই বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। সাম্প্রতিক এক বিশদ সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, নিউ টাউন এলাকার বিভিন্ন ব্লকে এমন ৩৮টি বহুতল ভবন রয়েছে, যেগুলি মূল নকশা বা পরিকল্পনা অনুযায়ী আবাসিক হিসেবে অনুমোদিত হলেও বর্তমানে সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এই গুরুতর বিষয়টি পর্ষদের নজরে আসার পরেই সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর মালিকদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছে। নিউ টাউনের মতো আধুনিক ও পরিকল্পিত জনপদে এই ধরনের অনিয়ম কখনোই বরদাস্ত করা হবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, এনকেডিএ-র গঠিত বিশেষ সার্ভে টিমের পক্ষ থেকে এই ৩৮টি বহুতলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মূলত আবাসিক হিসেবে অনুমোদিত বহুতল ভবনে আইন অমান্য করে দোকান, অফিস, স্টোরহাউস কিংবা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। সরকারি নিয়মনীতি অনুযায়ী, কোনো ভবনকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করতে হলে তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নেওয়া আবশ্যক এবং সেই অনুযায়ী বর্ধিত হারে পৌর কর বা হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদান করতে হয়। কিন্তু এই বহুতলগুলোর মালিকরা সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে এই অনিয়ম চালিয়ে আসছেন। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্বের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় অকারণ যানজট ও অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হচ্ছে। এই অননুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্যার পাহাড় তৈরি হয়েছে, তা প্রশাসনিক কর্তারা আর দীর্ঘায়িত করতে রাজি নন।

বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, অতীতের বিশৃঙ্খলা ও আইন অমান্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং শহরের পরিকাঠামো রক্ষা করাই বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে এনকেডিএ-র মতো সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার চেষ্টা করছেন, তবে প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, এটি কেবল প্রশাসনিক শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় এখানে বিবেচ্য নয়, একমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই পর্ষদের মূল উদ্দেশ্য।

বর্তমান শাসনে পরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর যে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তা নিউ টাউনের এই কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট। নিউ টাউন যেহেতু রাজ্যের অন্যতম প্রধান আইটি হাব এবং একটি পরিকল্পিত উপনগরী হিসেবে পরিচিত, তাই এখানকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার স্বার্থে এনকেডিএ এই উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অভিযুক্ত ভবন মালিকদের কাছ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। যদি কোনো মালিক সন্তোষজনক উত্তর প্রদান করতে ব্যর্থ হন, তবে আইন অনুযায়ী সেই ভবন সিল করা থেকে শুরু করে বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না পর্ষদ।

পর্ষদের এক ঊর্ধ্বতন আধিকারিক জানিয়েছেন, শুধু এই ৩৮টি বহুতল নয়, পর্যায়ক্রমে নিউ টাউনের প্রতিটি ব্লকে এই ধরনের সার্ভে অভিযান চালানো হবে। যদি অন্য কোনো এলাকায় বা ভবনে একই ধরনের অসংগতি বা নিয়মের লঙ্ঘন ধরা পড়ে, তবে সেখানেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই অভিযান আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্রতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে, কারণ এতে করে এলাকায় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে বাসিন্দারা মনে করছেন।

তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলিতে যারা ভাড়াটিয়া হিসেবে অফিস বা দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পর্ষদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিয়ম না মেনে বাণিজ্যিক কাজ চালানো কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ভাড়াটিয়াদেরও উচিত ভবন ব্যবহারের আগে তার বৈধতা যাচাই করে নেওয়া। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা কোনো জিজ্ঞাস্য থাকলে পর্ষদের দাপ্তরিক ওয়েবসাইট অথবা নিকটস্থ নোটিশ বোর্ডের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত নিউ টাউনকে বসবাসযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন রাখার স্বার্থে এই আইনি লড়াই জারি থাকবে বলে পর্ষদ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই দৃঢ় পদক্ষেপ ভবিষ্যতে অন্যান্য পরিকল্পিত শহরের ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।