রাশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানিয়েছেন, ২০২২ সালের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে প্রায় ৩২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি রফতানি করেছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার পরেও এই বাণিজ্যের পরিমাণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সোমবার প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাব এবং রাশিয়ার উপর জারি করা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ সত্ত্বেও মস্কো তার জ্বালানি রফতানির ধারা অব্যাহত রেখেছে। আলেকজান্ডার নোভাক আরও দাবি করেছেন যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস রফতানির পরিমাণ যুদ্ধের পূর্ববর্তী স্তরে পৌঁছে যেতে পারে। অর্থাৎ, পশ্চিমা বিশ্বের লাগাতার নিষেধাজ্ঞা এবং রফতানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও রাশিয়ার জ্বালানি অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে দাবি করেছে ক্রেমলিন।
উল্লেখ্য যে, ইউক্রেন যুদ্ধের সূত্রপাতের পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও রাশিয়ার এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিক্রির পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বিশ্ব বাজারে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের গুরুত্ব আজও অপরিসীম। বিশেষ করে এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের বাজারে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় মস্কো তার ক্ষতি অনেকাংশেই পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।
নোভাকের এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হচ্ছে। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা অব্যাহত রেখেছে, যা প্রমাণ করে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জ্বালানি শক্তির বাজারে রাশিয়ার আধিপত্য সহজে খর্ব হওয়ার নয়। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজস্ব নীতি অনুযায়ী রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সরবরাহ চেইন এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানির চাহিদার বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। রাজ্যের শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়কালে জ্বালানি নীতির যে রূপরেখা ছিল, তা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব কলকাতার সাধারণ মানুষের পকেটে কতটা পড়বে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েই গেছে। জ্বালানি তেলের দামের ওঠা-নামা ভারতীয় অর্থনীতির ওপর সবসময়ই প্রভাব বিস্তার করে। তাই বিশ্ব বাজারে রাশিয়ার এই বাণিজ্যের পরিসংখ্যান ভারতের তেল আমদানির ক্ষেত্রে কোনো নতুন সমীকরণ তৈরি করবে কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা চিন্তাভাবনা করছেন।
বর্তমানে ভারত সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে ডিসকাউন্টে তেল আমদানির নীতি গ্রহণ করেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সাহায্য করেছে। রাশিয়ার এই বাণিজ্যের দাবি সেই নীতিকেই কার্যত সমর্থন জোগাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই জ্বালানি বাণিজ্যের ভূ-রাজনৈতিক ফলাফল কী হবে, তা সময় বলবে। আপাতত ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেওয়া ৩২০ বিলিয়ন ডলারের এই হিসাবটি বিশ্ব অর্থনীতির বাজারে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত তথ্য বা বিভিন্ন দেশের আমদানির আলাদা খতিয়ান আপাতত সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।








