কলকাতার বুকে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্রের কারবার, যা নিয়ে শহরজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মহানগরীর উপকণ্ঠে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে হানা দেয় কলকাতা পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চালানো এই অভিযানে একটি গোপন ডেরা থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। শহরতলির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দিনের পর দিন কীভাবে এই ধরনের অপরাধমূলক কারবার চলছিল, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই এসটিএফ-এর গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল যে, শহরের কোনো একটি গোপন ডেরায় অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির কাজ চলছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা দীর্ঘ নজরদারি চালান। বুধবার বিকেলে নির্দিষ্ট ঠিকানায় হানা দিয়ে গোয়েন্দারা কার্যত অবাক হয়ে যান। ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় বন্দুক তৈরির আধুনিক লেদ মেশিন, ড্রিল মেশিন এবং বিপুল পরিমাণ লোহার কাঁচামাল। এছাড়াও কিছু তৈরি ও অর্ধ-তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে দীর্ঘ সময় ধরে এখানে নিয়মিত অস্ত্রের কারবার চলছিল।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে যে কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, এই ঘটনাটি আবারও তা প্রকাশ্যে নিয়ে এল। রাজ্যে অপরাধ দমনে পুলিশের এই সাফল্যকে ওয়াকিবহাল মহল ইতিবাচকভাবেই দেখছে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার পর রাজ্যের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক চাপানউতোরের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা এখন পুলিশের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রাক্তন সরকারের জমানায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রায়ই শিরোনামে উঠে আসত। এবার বর্তমান সরকারের আমলে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের এত কাছে এমন কারখানা খুঁজে পাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে লালবাজার। ধৃত ব্যক্তিকে জেরা করে পুলিশ জানতে চাইছে, এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলি মূলত কাদের কাছে সরবরাহ করা হতো। এর পেছনে কোনো বড় কোনো অপরাধী চক্র কিংবা আন্তঃরাজ্য কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তাও তদন্তকারী অফিসাররা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তকারী অফিসারদের মতে, যারা এই কারখানা চালাচ্ছিল, তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। কোনো প্রতিবেশী যাতে সন্দেহ করতে না পারে, সেই কারণে লোকালয়ের ভেতর অত্যন্ত সতর্কভাবে ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করে সেগুলি বিভিন্ন দুষ্কৃতীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করাই ছিল এদের মূল লক্ষ্য। ধৃতের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আরও বেশ কিছু জায়গায় তল্লাশি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এসটিএফ-এর বিশেষ দল।
এই ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, পাশের ঘরে ঠিক কী ঘটছে তা তারা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। পুলিশি তল্লাশির পরই তারা জানতে পারেন যে, তাদের চোখের সামনেই কত বড় এক ভয়ংকর কারবার চলছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় এলাকাবাসীরা হতবাক। পুলিশ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে এবং ওই ঘরের আশপাশে মানুষের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ফরেন্সিক দলকেও ঘটনাস্থলে ডাকা হয়েছে, যারা নমুনা সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।
তদন্তের খাতিরে এখনই বিস্তারিত কোনো তথ্য পুলিশের তরফে প্রকাশ করা হয়নি। তবে খুব দ্রুত এই চক্রের মূল পান্ডাকে এবং এর সঙ্গে জড়িত বাকিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তদন্তকারীরা। শহরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এসটিএফ এবং স্থানীয় থানা যৌথভাবে কাজ করছে। ধৃত ব্যক্তিকে আদালতে পেশ করে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে, যাতে জেরা করে এই অস্ত্র চোরাচালান চক্রের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। শহরবাসী এখন তাকিয়ে আছে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যাতে অপরাধী চক্রটি সম্পূর্ণরূপে সমূলে বিনাশ করা যায়।







