কলকাতার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পূর্ণরূপে কাজে লাগিয়ে গ্রেটার ম্যাঞ্চেস্টারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে উদ্যোগী হলেন গ্রেটার ম্যাঞ্চেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। শুক্রবার তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিল্পপতি এবং বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল কলকাতা এবং ম্যাঞ্চেস্টারের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি মজবুত ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। কলকাতার শিল্প ও ব্যবসায়ী মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার সময় মেয়র বার্নহ্যাম দুই শহরের যৌথ উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ চললেও, পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক পরিকাঠামোগত উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহল অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়েই বাংলায় বিদেশি বিনিয়োগ টানার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেছেন এবং শিল্পায়নের পথ প্রশস্ত করার কথা বলেছেন। প্রাক্তন সরকারের আমলে শিল্পায়নের যে পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলে তার আধুনিকীকরণ এবং আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এই পটভূমিতে গ্রেটার ম্যাঞ্চেস্টারের মেয়রের সফরকে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান এবং আকর্ষণীয় বিষয় ছিল ক্রিকেটের প্রসার ও উন্নয়ন। ম্যাঞ্চেস্টারে একটি বিশ্বমানের এবং অত্যাধুনিক ক্রিকেট কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মেয়র বার্নহ্যাম। এই প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য তিনি কলকাতার বিশেষজ্ঞ, ক্রিকেট প্রশাসক এবং কোচিং জগতের ব্যক্তিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা চেয়েছেন। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন প্রকল্প যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দুই শহরের ক্রীড়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এছাড়া, শহরের সামগ্রিক পরিকাঠামোর উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির আদানপ্রদান নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সরকারি সূত্র থেকে জানা গেছে।
মেয়র বার্নহ্যাম তাঁর বক্তব্যে জানিয়েছেন যে, ম্যাঞ্চেস্টার শহরটি বরাবরই আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের খোঁজে থাকে এবং সেই দিক থেকে কলকাতা তাদের কাছে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত গন্তব্য। ডিজিটাল ইকোনমি বা ডিজিটাল অর্থনীতি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং সমৃদ্ধ ক্রীড়া সংস্কৃতি—এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। তবে, এই বৃহত্তর প্রকল্পের জন্য ঠিক কত কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে অথবা কবে নাগাদ এই প্রকল্পের কাজ বাস্তব ক্ষেত্রে শুরু হবে, সেই সংক্রান্ত কোনো বিশদ আর্থিক তথ্য এই মুহূর্তে সরকারি বা বেসরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
রাজ্যের শিল্প মহল এই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলার শিল্প মানচিত্র যখন পুনরায় নতুন রূপ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, সেই সন্ধিক্ষণে গ্রেটার ম্যাঞ্চেস্টারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের বাণিজ্যিক আগ্রহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য সরকার এবং ব্যবসায়ী মহলের এই যৌথ প্রয়াস বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। যদিও বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই সফর নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বা কঠোর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে সাধারণ মানুষ আশা করছেন, আন্তর্জাতিক এই যোগাযোগ রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তুলবে।
উল্লেখ্য যে, ম্যাঞ্চেস্টারের মেয়রের এই সফরের মাধ্যমে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লেনদেনই নয়, বরং শিক্ষা এবং সংস্কৃতির আদানপ্রদানও ভবিষ্যতে অনেক বেশি সহজতর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কলকাতার সঙ্গে ম্যাঞ্চেস্টারের এই সেতুবন্ধন দুই শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোর মধ্যেও এক ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র তৈরি করতে পারে। আগামী দিনে কলকাতার কোনো প্রতিনিধি দল ম্যাঞ্চেস্টার সফর করবেন কি না, তা নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা হলেও এর চূড়ান্ত রূপরেখা এখনো সরকারিভাবে নির্ধারিত হয়নি। সব মিলিয়ে গ্রেটার ম্যাঞ্চেস্টারের মেয়রের এই কলকাতা সফর রাজ্যের বাণিজ্য ও ক্রীড়া মহলে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। এই সম্পর্ক যদি সঠিকভাবে এগিয়ে যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে কলকাতা বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান আরও সংহত করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।







