মানবাধিকারের নামে যারা গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করে, তাদের প্রতি ভারতের কড়া জবাব

জাতিসংঘে মানবাধিকার বিষয়ে ভারত তার অবস্থান সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে তুলে ধরেছে। ভারত বিশ্বজুড়ে দেশগুলোকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, মানবাধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, কিন্তু এই বিষয়টি যেন রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম বা কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কলঙ্কিত করার অস্ত্র না হয়ে ওঠে। নয়াদিল্লি খোলাখুলিভাবে জানিয়েছে যে, অকাট্য প্রমাণ ছাড়া বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে তার গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে তাদের তীব্র আপত্তি রয়েছে। ভারত আলোচনায় তথ্যপ্রমাণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটির সামনে ভারতের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বরখা তাম্রকর স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ভারতকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্য কাঁচা প্রতিবেদন, অসম্পূর্ণ তথ্য বা বেনামী দাবি উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। ভারত আরও বলেছে যে, কোনো বিষয়ে যদি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা মূল নথি থাকে, তবে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসারে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। তবে, কারও অভিযোগ বা অসম্পূর্ণ কথোপকথনকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ঠিক নয়। ভারত সমস্ত দেশকে প্রতিবেদন উল্লেখ করার সময় বিষয়বস্তু এবং প্রেক্ষাপট উভয়ই বজায় রাখার জন্য আবেদন জানিয়েছে।

তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রকৃত ও যথাযথ নথিপত্র দ্বারা সমর্থিত বিষয়ে ভারত প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসারে ব্যাখ্যা দিতে প্রস্তুত। তবে, কোনো মানবিক অভিযোগ বা যোগাযোগকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা সঠিক নয়। তিনি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলকে প্রতিবেদনগুলো উল্লেখ করার সময় সেগুলোর মূল বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট বজায় রাখার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।

তৃতীয় কমিটিতে বলপূর্বক অন্তর্ধান বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার সময় ভারত বেনামী অভিযোগ এবং অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করেন যা যাচাই করা হয় না এবং তথ্যদাতাদের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয় না। ভারত মনে করে যে, যথাযথ সতর্কতা ও যাচাই-বাছাই ছাড়া এই ধরনের তথ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

ভারতও তার আইনি অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। তাম্রকর ব্যাখ্যা করেন যে, আমাদের দেশ আইনের শাসনে বিশ্বাসী এবং সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ সকলের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বেআইনিভাবে গুমের মতো কোনো অভিযোগ উঠলে, আদালত হেবিয়াস কর্পাসের মতো রিটের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করতে পারে । ভারতে জাতীয় ও রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের মতো প্ল্যাটফর্মও রয়েছে এবং তথ্য অধিকার আইন সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে। একটি স্বাধীন গণমাধ্যম এবং একটি সক্রিয় নাগরিক সমাজও অধিকার পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাম্রকর বলেন যে, ভারত আইনের শাসনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি গণতন্ত্র। সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা করে। বিচার বিভাগের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, আদালত হেবিয়াস কর্পাসের মতো সাংবিধানিক প্রতিকারের মাধ্যমে কথিত অবৈধ আটক বা গুমের মতো মামলায় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং রাজ্য মানবাধিকার কমিশনগুলোও অভিযোগ প্রতিকারের ফোরাম। অধিকন্তু, তথ্য অধিকার আইন সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করে। তিনি অধিকার প্রয়োগ পর্যবেক্ষণে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম এবং একটি সক্রিয় নাগরিক সমাজের গুরুত্বের ওপরও জোর দেন।

আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রসঙ্গে ভারত ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। বলপূর্বক অন্তর্ধান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদের কথা উল্লেখ করে ভারত স্পষ্ট করেছে যে, কেবল একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা এবং সেটিকে সম্পূর্ণরূপে অনুমোদন করা দুটি ভিন্ন বিষয়; শুধুমাত্র স্বাক্ষর করাকে সমস্ত বাধ্যবাধকতা মেনে নেওয়া হিসেবে গণ্য করা যায় না।

পরিশেষে, ভারতের বার্তা স্পষ্ট: মানবাধিকার আলোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা তথ্য, ন্যায্যতা এবং সমতার ওপর ভিত্তি করে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে, যদি সমস্ত অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়, প্রতিবেদনগুলোকে তার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিচার করা হয় এবং সব দেশের সঙ্গে সমান আচরণ করা হয়।