ডিসেম্বরেই কলকাতা পুরভোটের সম্ভাবনা, প্রস্তুতি তুঙ্গে রাজনৈতিক মহলে

কলকাতা পুরসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে যে উত্তেজনার পারদ চড়ছে, তা এখন কার্যত তুঙ্গে। গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে যে জল্পনা দানা বেঁধেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহেই নির্বাচনের মহড়া সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০ ডিসেম্বর নাগাদ ভোটগ্রহণের সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কাজকর্ম যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে বড় কোনো আইনি বাধা তৈরি না হলে এই তারিখেই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ভোটগণনা এবং ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রেও ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বড়দিনের উৎসব শুরুর আগেই অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বরের পূর্বেই নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। এরপর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই নতুন বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কলকাতা পুরসভাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে প্রশাসন। কালীপুজোর উৎসব শেষ হওয়ার পরপরই কার্যত পুরভোটের দামামা বেজে উঠেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এখন তাদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে তৎপর।

সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, রাজ্যের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত। ১৫ বা ১৬ নভেম্বরের মধ্যেই দল তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে ফেলতে পারে বলে খবর। এই বিষয়ে রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য তথা পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ডিসেম্বরেই নির্বাচন হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত এবং সেই অনুযায়ী দাপ্তরিক ও সাংগঠনিক স্তরে প্রস্তুতি চলছে। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, গত লোকসভা নির্বাচনের পর জনমানসে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, পুরভোটের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটবে।

তবে এই নির্বাচনের আবহে বিরোধী দলগুলোর তরফ থেকে তীব্র সমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক মদন মিত্র বিজেপির এই পরিকল্পনাকে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেছেন যে, বিজেপির বিলম্বিত সিদ্ধান্ত তাদের আসন সংখ্যা কমিয়ে দেবে। তিনি দাবি করেছেন, যত দ্রুত নির্বাচন হবে, তৃণমূলের জন্য ততই তা সুবিধাজনক। অন্যদিকে, সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন নিয়ে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জোর আপত্তি তোলা হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতা জেলা সভাপতি বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন যে, ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক ভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। তাদের স্পষ্ট দাবি, ২০২৪ সালের হালনাগাদ ভোটার তালিকা মেনেই নির্বাচন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

নির্বাচনের এই ডামাডোলের মাঝে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে রক্ষায় কতটা সক্ষম, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে নির্বাচনের ময়দানে একটি শক্তিশালী বিকল্প গড়ে তোলা যায়।

উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক পালাবদলের পর ৮ জুন মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের পর একটি প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। ওই দিনই পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকে পুরসভার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, তাঁর এই দায়িত্বের মেয়াদ ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং নির্বাচনের দিনক্ষণ কাছাকাছি থাকায়, নতুন বোর্ড গঠিত না হওয়া পর্যন্ত স্মিতা পাণ্ডেই প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত প্রশাসনিক নির্দেশিকা আসার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।

বিজেপির দাবি, তৃণমূলের বিদায়ের মাধ্যমে রাজ্যে একটি স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে, রাজ্যে অঘোষিত একনায়কতন্ত্র চলছে এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে। রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই এখন সকলের নজর রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী নির্দেশিকার দিকে। প্রশাসন চূড়ান্তভাবে কোন দিনক্ষণ ঘোষণা করে এবং বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী লড়াইয়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে কলকাতার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ডিসেম্বরের এই নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে চলেছে।