সাজার মেয়াদ শেষ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি না হওয়ায় দেশে ফিরতে পারছেন না বাংলাদেশী এক দম্পতি

ফাইল চিত্র।

প্রনব বিশ্বাসঃ  কাজের জন্য ভারতে পা। বুমেরাং হয়ে সাজা কাটতে হল এক বাংলাদেশি দম্পতির। এখন সাজার মেয়াদ শেষ, কিন্তু দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় নথি তৈরি না হওয়ায় থানায় সংসার পেতেছেন বাংলাদেশি ওই দম্পতি। না এ কোনও গল্প নয়, এটাই ঘটেছে  ভারতের মহারাষ্ট্রে। মহারাষ্ট্রের একটি থানার একটি ঘরেই আপাতত সংসার পেতেছেন ওই বাংলাদেশি দম্পতি। গত দুই মাস ধরে তাঁদের সংসার চালানোর খরচও বহন করছে থানা কর্তৃপক্ষ।

ঘটনাটি ঠিক কি ? 

সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই, তাই দুই সন্তানকে দেশে রেখেই ভারতে আসার স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশি দম্পতি মহম্মদ মন্ডল ও মাজিদা মন্ডল। সেইমতো কোম্পানিতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে দালাল মারফত অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে আড়াই বছর আগে বাংলাদেশ থেকে মহারাষ্ট্রের পুণে শহরে এসে পৌঁছয় ওই দম্পতি। কিন্তু ভারতে পৌঁছেই চরম বিপাকে পড়েন তারা। বেরিয়ে আসে দালালের আসল রূপ।

যে দালালের হাত ধরে তারা ভারতে আসেন সেই দালালই ওই বাংলাদেশি দম্পতিকে পুণের বুধওয়ার পেথ নামক একটি নিষিদ্ধপল্লী এলাকায় একটি ঘরে আটকে রাখে বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে বাংলাদেশি নারীকে বেশ্যাবৃত্তির জন্য চাপ দিতে থাকে ওই দালাল। কিন্তু ওই বাংলাদেশি তাতে অসম্মতি জানানোয় একসময় তাদের জেলে পাঠানোরও হুমকি দেয়। যদিও ইতিমধ্যেই গোটা বিষয়টি জানতে পারে পুণের ফরাসখানা থানার পুলিশ ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে ও পরে আটক করে।

ভারতীয় আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইন ও ১৪ ফরেনার্স আইনে মামলা হয়। আদালতের নির্দেশে দুই বছরের বেশি সময় কারাগারের মেয়াদও ভোগ করতে হয় ওই দম্পতিকে। কিন্তু নিজেদের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি না হওয়ার কারণে থানা চত্বরেই একটি ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে থানা কর্তৃপক্ষ। গত প্রায় দুই মাস ধরে সেখানেই অবস্থান করছে ওই বাংলাদেশি দম্পতি।

মাজিদা মন্ডল জানান ‘কোম্পানিতে কাজ পাওয়ার আশায় দেশের বাসায় দুই ছেলেকে রেখে ভারতে চলে আসি। কিন্তু পুণেতে আসার পরই দালাল আমাকে বুধওয়ার পেথ নামক যৌনপল্লীতে পতিতাবৃত্তি পেশায় যোগ দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু আমি যখন তার প্রতিবাদ করি, কাজ করতে অসম্মতি জানাই তখন আমার স্বামীকে গ্রেফতার করিয়ে দেয়। কারণ আমাদের কারো কাছেই বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা ছিল না। যাইহোক আমি কোনভাবে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে থানায় পৌঁছই এবং গোটা বিষয়টি জানাই। তখন অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগ আমাকেও গ্রেফতার করা হয়।’

মাজিদা আরও জানায় ‘দালাল আমাদের কোম্পানিতে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভারতে নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা যদি আগে বিষয়টি জানতাম আমাদের এই সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে, তবে পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া কিছুতেই ভারতে আসতাম না। যে দালাল আমাদের এখানে নিয়ে আসে, সেই আমাদেরকে গ্রেফতার করিয়ে দিল। কিন্তু দুই বছর কারাগারের মেয়াদ কাটানোর পর আমরা এখন দেশে ফিরতে চাই। দেশের বাড়িতে আমার দুই সন্তান খুবই সমস্যায় আছে। আমরা এখন চাইছি শিগগিরি আমাদের দেশে ফেরত পাঠানো হোক।’

মাজিদার স্বামী মহম্মদ মন্ডলের অভিমত, দালালের হাত ধরে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা বাংলাদেশ থেকে পুনের বুধওয়ার পেট এলাকায় এসে পৌঁছয়। এরপর সেখানেই একটি ঘরে তাদের আটকে রাখা হয়। কিন্তু ওই দালাল চেয়েছিল তার স্ত্রীকে পতিতাবৃত্তি পেশায় নামানো কিন্তু তাতে সফল না হওয়ার কারণেই দালাল জেলের হুমকি দেয়। কিন্তু যেভাবেই হোক পুণের পুলিশ গোটা বিষয়টি জানতে পেরে তাদের আটকে করে।

এরপর আদালতের নির্দেশে প্রায় দুই বছর তিন মাস তাদের পুণের ইয়েরওয়াড়া জেলে (সংশোধনাগার) কাটাতে হয় ওই দম্পতিকে। গত জুন মাসে কারাগারে সাজার মেয়াদ শেষে আদালতের নির্দেশে তাদের পুণের ফরসখানা থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে গত দুই মাস ধরে ওই থানাই হয়ে উঠেছে ওই বাংলাদেশি দম্পতির আশ্রয়স্থল। আর কার্যত সেই সময় থেকেই থানা কর্তৃপক্ষের তরফে নিয়মিত বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাছে আর্জি জানিয়ে আসছে ওই বাংলাদেশি দম্পতিকে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যপারে উদ্যোগ নিতে। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তাদের নথি তৈরি না হওয়ায় এখনও দেশে ফেরত যেতে পারেনি ওই দম্পতি।

এব্যাপারে ফরাসখানা থানার ইন্সপেক্টর রাজেন্দ্র ল্যান্ডেজ জানান ‘বাংলাদেশের খুলনার বাসিন্দা মহম্মদ মন্ডল ও মাজিদা মন্ডল ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পুণে আসেন এবং বুধওয়ার পেথ এলাকায় থাকতেন। আমরা যখন জানতে পারলাম যে কোনরকম বৈধ পাসপোর্ট ছাড়াই তারা ভারতে আসেন, আমাদের টিম গিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইন ও ১৪ ফরেনার্স আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পরে বিষয়টি আদালতে ওঠায় তাদের দুই বছরের জেল হয়।

গত ১৪ জুন তাদের কারাগারের সাজার মেয়াদ শেষ হয় এবং ওই দম্পতিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য পুণে পুলিশকে নির্দেশ দেয় আদালত।’পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান ‘গত দুই মাস ধরে আমরা বাংলাদেশ হাই কমিশনের সাথে এব্যাপারে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছি, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোন সদর্থক বার্তা আসেনি। আদালতের নির্দেশ মেনেই আমরা তাদের আমাদের থানা চত্বরে থাকার অনুমতি দিয়েছি এবং তাদের চা-নাস্তা-খাবার সহ দৈনন্দিন যাবতীয় বন্দোবস্তও আমরাই করছি।’
জানা গেছে থানার ভিতরেই নিজেদের ঘরে ওই বাংলাদেশি দম্পতি ধর্মীয় রীতিনিতি পালন ও নিয়মিত নামাজও আদায় করছেন। দেশে দুই সন্তানের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলারও ব্যবস্থা করেছে থানা কর্তৃপক্ষ। এমনকি গত মাসে বকরি ইদে ওই দম্পতিকে নতুন পোশাক কিনে দেওয়া হয় ফরসখানা থানার তরফে। থানার পুলিশ কর্মীদের সাথেই ঈদও পালন করেন ওই দম্পতি। এখন কেবল দেশে ফেরার অপেক্ষায় ওই দম্পতি।
তবে আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত ওই দালালের সন্ধান পায় নি পুলিশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here