কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যের শিল্পায়নের মরা গাঙে জোয়ার আনতে এবং রাজ্যের অর্থনীতিকে নতুন দিশা দেখাতে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী এক অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। বুধবার কলকাতায় আয়োজিত এক বিশেষ শিল্প সম্মেলনে রাজ্যের বিশিষ্ট শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিতে তিনি রাজ্যের নতুন শিল্প নীতি ঘোষণা করলেন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নীতিটি রাজ্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির এক আমূল পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো, জমি সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বজায় রাখা। এদিন মুখ্যমন্ত্রী শিল্পপতিদের সনির্বন্ধ আহ্বান জানান, তাঁরা যেন পশ্চিমবঙ্গে এসে নতুন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করেন এবং বাংলার শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন।
শিল্প সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে এবং স্পষ্টভাবে রাজ্য সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “আগে রাজ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট বা দূরদর্শী জমি নীতি ছিল না। বাম আমলের লাগামহীন ধ্বংসাত্মক শ্রমিক আন্দোলন এবং পরবর্তী তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে রুজি-রোজগারের তাগিদে রাজ্যের মেধাবী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার করুণ ঘটনা রাজ্যবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। বর্তমানে আমাদের রাজ্যে দুই কোটিরও বেশি শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী রয়েছেন, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা অত্যন্ত চিন্তিত। আমাদের বর্তমান সরকার সেই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে রাজ্যকে মুক্তি দিতে বদ্ধপরিকর এবং প্রতিটি পদক্ষেপ সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।”
শিল্পে জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘদিনের জটিলতা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অভয় দিয়ে জানান, এখন থেকে শিল্পপতিদের সরাসরি জমি কেনার জটিল ঝক্কি আর পোহাতে হবে না। রাজ্য সরকার নিজেই এই জমি নীতি তৈরির কাজটি দক্ষতার সাথে করছে। শিল্পের সুবিধার্থে সরকার জমি সংগ্রহের সম্পূর্ণ বিষয়টি নিশ্চিত করবে যাতে প্রকল্পগুলি সময়মতো শুরু হতে পারে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “এখন তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এবং কাটমানির ঘৃণ্য সংস্কৃতি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যে ভয়ের পরিবেশ এবং অনিশ্চয়তা ছিল, তা এখন সুদূর অতীত। এখন পশ্চিমবঙ্গে ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’—এই মূল মন্ত্রেই আমাদের সরকার কাজ করছে।”
পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর সমালোচনা করে সুভেন্দু অধিকারী বলেন, বিজেপি কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করা দল নয়। আমাদের সরকার নির্বাচনী সংকল্পপত্রে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজ্যের মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছেন সামগ্রিক ব্যবস্থা বদলানোর জন্য, শুধু মুখ বদলানোর জন্য নয়। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, বাম এবং তৃণমূলের শাসনামলে রাজ্যের শিল্প পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই পশ্চিমবঙ্গকে নতুন করে পুনর্নির্মাণের দুরূহ কাজ শুরু হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে অনেক প্রাইভেট আইটিআই প্রতিষ্ঠানে কেবল ব্যবসার ছক তৈরি করা হয়েছিল। কোনো উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, দক্ষ ফ্যাকাল্টি, লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরি ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সার্টিফিকেট বিলি করা হত। এই ভ্রান্ত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে মেধার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়, তাই আইটিআইগুলির মানোন্নয়নে জোর দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পে অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কোথাও কাজ বন্ধ করে দাবি-দাওয়ার নামে নৈরাজ্য বরদাস্ত করা হবে না। দাবি থাকতেই পারে, তার জন্য লেবার কমিশনার রয়েছেন, সরকার রয়েছে, পুলিশ প্রশাসন রয়েছে। আলোচনার টেবিল খোলা আছে। কিন্তু কারখানার গেটে ঝামেলা পাকিয়ে কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ১৫ মিনিটের মধ্যে জেলে যেতে হবে। শান্তি বজায় না রাখলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শিলিগুড়িতে আইআইটি ও আইআইএম-এর মতো বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চাইছেন সুভেন্দু অধিকারী। এখন দেখার, এই নতুন শিল্প নীতির হাত ধরে রাজ্যে বিনিয়োগের স্রোত কতটা গতি পায় এবং শিক্ষিত তরুণদের জন্য কতটা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বিস্তারিত তথ্য, যেমন নতুন শিল্প নীতির প্রতিটি ধারা বা নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে রাজ্য সরকার খুব শীঘ্রই আরও বিশদ নথি প্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলার মানুষ এখন উন্নয়নের অপেক্ষায় তাকিয়ে।








