কলকাতার গণপরিবহন ব্যবস্থায় অ্যাপ-ক্যাব পরিষেবা এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির চালু করা নতুন ‘ফেয়ার বিডিং’ বা দর কষাকষির নীতি নিয়ে শহরজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এই বিতর্কিত ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন চালকদের আয়ের নিশ্চয়তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রীদের পকেট কাটার প্রবণতাও আকাশছোঁয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছেন অ্যাপ-ক্যাব চালকদের সংগঠন এবং বিভিন্ন নাগরিক মহল। অবিলম্বে এই নিয়ম বাতিলের দাবি জানিয়ে মন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার এই গুরুতর বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন চালক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবির মূল কথা হলো, এই নতুন ‘বিডিং’ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত এবং এটি পরিবহন পরিষেবার নৈতিক পরিকাঠামোকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। মন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অ্যাপ-ক্যাব সংস্থাগুলি সরকারের বেঁধে দেওয়া ভাড়ার কাঠামোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ভাড়া নির্ধারণ করছে। এটি সরাসরি রাজ্য পরিবহন দফতরের নীতিমালার পরিপন্থী। চালকরা জানিয়েছেন যে, এই বিডিং প্রক্রিয়ার ফলে চালকদের মধ্যে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়েও তাঁরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
যাত্রীদের অভিযোগ, এই বিডিং পদ্ধতির আড়ালে কার্যত এক ধরনের ‘লুঠ’ চলছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে বা যখন সাধারণ গণপরিবহন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সংস্থাগুলো কৃত্রিমভাবে গাড়ির চাহিদা বাড়িয়ে দেয় এবং বিডিংয়ের নাম করে সাধারণ ভাড়ার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি টাকা দাবি করে। জরুরি প্রয়োজনে যারা অ্যাপ-ক্যাবের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা এই আকাশছোঁয়া ভাড়ার কারণে চূড়ান্ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সমস্যার সমাধান চেয়ে অবশেষে মন্ত্রী পর্যায়ের হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
মন্ত্রী অর্জুন সিং সম্পূর্ণ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শোনার পর তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকারের কাছে যাত্রী এবং চালক উভয় পক্ষের স্বার্থই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংস্থা যদি পরিবহন দফতরের নিয়ম লঙ্ঘন করে বা গ্রাহকদের হয়রানি করার জন্য নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে এমন কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেয়, তবে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন এবং এই বিডিং সংক্রান্ত সমস্যার একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছেন।
শহরের পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অ্যাপ-ক্যাব পরিষেবাকে একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনা এখন সময়ের দাবি। বিডিং ব্যবস্থা চালুর ফলে পরিবহন বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ নিত্যযাত্রীদের। যদি এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না হয়, তবে শহর কলকাতার পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে বা জরুরি প্রয়োজনে যখন মানুষের গাড়ির খুব প্রয়োজন থাকে, তখন এই বিডিং ব্যবস্থার জেরে ভাড়ার যে আগুন দেখা যায়, তা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তোলার জন্য যথেষ্ট।
অন্যদিকে, অ্যাপ-ক্যাব সংস্থাগুলির একাংশের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য তারা এই ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তাদের যুক্তি, এটি প্রযুক্তিগত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। তবে পরিবহন আইন বিশেষজ্ঞ ও সরকারের মতে, কোনো বেসরকারি সংস্থার ব্যবসায়িক কৌশল কখনোই জনস্বার্থ বা সরকারি নীতিকে উপেক্ষা করতে পারে না। চালক সংগঠনের নেতারা হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, যতদিন না এই বিডিং ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে, ততদিন তারা আন্দোলনের পথ থেকে সরবেন না।
আসন্ন দিনগুলিতে পরিবহন দফতরের পক্ষ থেকে কী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে কলকাতার আমজনতা। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, মন্ত্রী অর্জুন সিং খুব শীঘ্রই পরিবহন সচিবের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন এবং প্রয়োজনে সংস্থাগুলির প্রতিনিধিদের ডেকে পাঠিয়ে কারণ দর্শাতে বলা হতে পারে। এখন সকলেই তাকিয়ে আছেন পরবর্তী সরকারি নির্দেশিকার দিকে। একদিকে অ্যাপ-ক্যাবের আধুনিক সুবিধা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন পরিবহন দফতরের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। শহরবাসী আশা করছেন, দ্রুত আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই ‘ফেয়ার বিডিং’-এর নামে চলা অরাজকতা বন্ধ হবে এবং যাত্রী পরিষেবায় স্বাভাবিকতা ফিরবে।








