বাংলায় এনআইএ-র ধাঁচে বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা গড়ার ভাবনা শাহের

কলকাতার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সূত্রের খবর, এই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে এবার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ-র আদলে রাজ্যে একটি বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা গঠনের প্রস্তাব নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে খবর। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ কমাতে এবং বিশেষ করে আন্তঃরাজ্য অপরাধ ও জঙ্গি কার্যকলাপ দমনে এই ধরনের একটি বিশেষায়িত সংস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। এনআইএ যেভাবে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে কাজ করে, ঠিক সেই ধাঁচে এমন একটি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে যা প্রয়োজনে রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করবে। তবে এই সংস্থার সাংবিধানিক এক্তিয়ার এবং রাজ্যের সঙ্গে তাদের কাজের পরিধি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত কোনো রূপরেখা সামনে আসেনি।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশেষ কিছু এলাকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধির তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রয়েছে। এই প্রেক্ষিতেই অমিত শাহ এই পর্যালোচনা বৈঠকটি তলব করেছিলেন। বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আইবি আধিকারিকদের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধী দলগুলি সরব। এবার সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চা শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যিই এনআইএ-র ধাঁচে কোনো সংস্থা রাজ্যে তৈরি করা হয়, তবে তা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে নতুন কোনো সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় এই ধরনের আমূল পরিবর্তন আনতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের সহযোগিতা বা সাংবিধানিক জটিলতাগুলি কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এখনো এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়িত করার জন্য কী কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও উপলব্ধ নয়।

বৈঠকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং চোরাচালান বন্ধ করার বিষয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না। নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগামী দিনে এই প্রস্তাব কতদূর অগ্রসর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

উল্লেখ্য, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা মূলত রাজ্য সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেই জায়গা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপকে কেন্দ্র ও রাজ্যের প্রশাসনিক সম্পর্কের নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া জানানো হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে বিশেষজ্ঞ মহল। আপাতত এই বিশেষ সংস্থা গঠনের প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেই সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট নথি বা কোনো আইনি খসড়া জনসমক্ষে আনা হয়নি। তাই বিস্তারিত কোনো তথ্য এই মুহূর্তে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে এই প্রস্তাবিত সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আরও কয়েক দফা বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকরা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এদিনের বৈঠকে রাজ্য পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের সাথেও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আলোচনার সারসংক্ষেপ নিয়ে কোনো সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা সংক্রান্ত বিষয় হওয়ায় প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।