কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক মানচিত্রে আসতে চলেছে এক বিরাট পরিবর্তন। শহর কলকাতার ২০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ২১টি ওয়ার্ডকে ভেঙে নতুন ওয়ার্ড তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে কলকাতা পুরসভার মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা বর্তমানে ১৪৪ থেকে বেড়ে ২০০-তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পুরসভা সূত্রের খবর, শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক কাজের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এই বড়সড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহলে এই খবরের পর থেকেই নতুন বিন্যাস নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।
কলকাতা পুরসভার বর্তমান গঠন অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক আয়তন ভিন্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় জনঘনত্ব অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয় পরিষেবা প্রদান, নিকাশি ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই পুর কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্য সরকার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণের পর ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের এই চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রাথমিকভাবে ২১টি ওয়ার্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে যেগুলিকে একাধিক ভাগে বিভক্ত করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক কাজের পরিধি ছোট হবে এবং পুর পরিষেবা সরাসরি নাগরিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সহজতর হবে বলে মনে করছেন পুরসভার শীর্ষ আধিকারিকরা।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পুনর্বিন্যাসের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলির ভোটার তালিকা এবং গত কয়েক বছরের আদমশুমারির রিপোর্টের ভিত্তিতে নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করা হবে। যে ২১টি ওয়ার্ডকে ভাঙার কথা ভাবা হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই দক্ষিণ এবং শহরতলি সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এই ওয়ার্ডগুলো থেকে কয়েকটি নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলে প্রতিটি ওয়ার্ডের ওপর কাজের চাপ অনেকটাই কমবে। তবে, এই প্রক্রিয়ার ফলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আগামী দিনে নির্বাচন কমিশন এবং পুর বিষয়ক দপ্তরের সমন্বয়ে এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে।
তবে ওয়ার্ড বাড়লে কাউন্সিলরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক খরচের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরসভা কতগুলো নতুন ওয়ার্ড তৈরির চূড়ান্ত অনুমোদন পায়, তা এখন দেখার বিষয়। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ২০০ ওয়ার্ডের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রতিটি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা পুনর্বিন্যাস একটি জটিল প্রক্রিয়া। এজন্য এলাকা জরিপের কাজ শুরু করা হয়েছে। বাসিন্দাদের মতামত বা এই সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় গেজেট নোটিফিকেশন পর্যায়ক্রমে জারি করা হবে।
কলকাতার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন হতে চলেছে। স্বাধীনতার পর থেকে একাধিকবার ওয়ার্ডের সংখ্যা পরিবর্তিত হয়েছে, তবে ১৪৪ থেকে এক লাফে ২০০-তে পৌঁছানোর বিষয়টি শহরের কাঠামোয় ব্যাপক রদবদল আনবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, এই পুনর্বিন্যাস নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। অন্যদিকে, শাসকদলের যুক্তি, উন্নয়নের স্বার্থে এলাকা ছোট করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সব মিলিয়ে, কলকাতা পুরসভার নতুন ওয়ার্ড বিন্যাস এখন শহরবাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত বিস্তারিত মানচিত্র প্রকাশ করার কথা রয়েছে রাজ্য সরকারের। আপাতত প্রশাসনিকস্তরে জোরকদমে কাজ চলছে এই ২০০ ওয়ার্ডের প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির কাজ। নতুন ওয়ার্ড গঠনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা আর্থিক বরাদ্দের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে বর্তমানে সরকারিভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মনে করা হচ্ছে, খুব দ্রুত এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত নির্দেশিকা জারি করবে রাজ্য নগরোন্নয়ন দপ্তর।








