প্রাথমিক শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নিয়ে বড়সড় সিদ্ধান্ত বিজেপির

রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে এবার সরাসরি শিক্ষক মূল্যায়নের সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার। রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এমন এক বড়সড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে শিক্ষা দপ্তর। সরকারি সূত্রে খবর, এবার থেকে শিক্ষকদের কেবল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়, বরং তাঁদের কাজের মান ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই ইনক্রিমেন্ট নির্ধারিত হবে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রীতিমতো ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন শিক্ষক সংগঠনগুলি। তাদের দাবি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট শিক্ষকদের একটি সাংবিধানিক অধিকার, যা কোনওভাবেই পারফরম্যান্সের শর্তে বেঁধে দেওয়া যায় না।

শিক্ষা দপ্তরের অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পঠনপাঠনের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতা বৃদ্ধির জন্য গত কয়েক মাস ধরেই একটি বিশেষ মডেল নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিল সরকার। সেই মডেল অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষকের জন্য একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হবে। এর মধ্যে থাকবে ক্লাসে শিক্ষকের উপস্থিতির হার, পড়ানোর দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের প্রগতির হার এবং বিদ্যালয় পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন ভূমিকা। যে সকল শিক্ষক এই মূল্যায়নে সফল হবেন, তাঁরাই শুধুমাত্র পূর্ণ মাত্রায় বেতন বৃদ্ধির সুযোগ পাবেন। যারা নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হবেন, তাদের ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা বা বিধিনিষেধ আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই নয়া প্রস্তাবনার কথা প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যের শিক্ষা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের দাবি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে আসা শিক্ষকদের ওপর এই ধরণের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া এক ধরণের মানসিক চাপ। সংগঠনের নেতাদের কথায়, শিক্ষাদান এক ধরণের সৃজনশীল কাজ। এটিকে শুধুমাত্র কিছু গাণিতিক প্যারামিটার বা তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এটি কার্যকর হলে বিদ্যালয়গুলোতে অযথা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে, যা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়াও, বর্তমান কাঠামোয় যে পরিমাণ কর্মী ঘাটতি রয়েছে, তাতে এমন নিয়ম কার্যকর করা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের পাল্টা যুক্তি হিসেবে শিক্ষা দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া বেতনের বিনিময়ে যথাযথ পরিষেবা পাওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। যারা নিরলসভাবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের উৎসাহিত করতেই এই পারফরম্যান্স ভিত্তিক বেতন কাঠামোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এতে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে দায়বদ্ধতা বাড়বে এবং ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ও শিক্ষার পরিবেশের মানোন্নয়ন হবে।

ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে আলোচনার জন্য শিক্ষা দপ্তরের কাছে আর্জি জানিয়েছে শিক্ষক সংগঠনগুলো। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, যদি অবিলম্বে এই পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা না হয়, তবে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। যদিও রাজ্য সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অনড় বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে পুরো বিষয়টি প্রশাসনিক স্তরে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগামী দিনে এই নিয়ম ঠিক কী কী মাপকাঠির ভিত্তিতে কার্যকর হবে এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য কোন সংস্থা বা কমিটি কাজ করবে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করা হবে কি না, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিস্তারিত তথ্যের অভাবে এই নতুন নিয়ম ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি নিশ্চিত যে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্যের রাজনীতি এবং শিক্ষা দপ্তর এক বড় ধরনের সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।