আসামে ১০ দিন গা ঢাকা, অবশেষে খাঁচাবন্দি বক্সার বাঘিনী

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের দীর্ঘদিনের আতঙ্কের অবসান ঘটল অবশেষে। গত দশ দিনের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর অবশেষে খাঁচাবন্দি হলো বন দপ্তরের ঘুম কেড়ে নেওয়া সেই বাঘিনী। গত ৩৪ দিনে এই নিয়ে তৃতীয়বার বাঘিনীটিকে ট্রাঙ্কুলাইজ বা চেতনানাশক ইনজেকশন প্রয়োগ করে কব্জা করতে সক্ষম হলেন দক্ষ বনকর্মীরা। জানা গেছে, বাঘিনীটি গত কয়েকদিন ধরে বক্সা সংলগ্ন এলাকা পেরিয়ে আসামের বিভিন্ন বনাঞ্চল ও জনবসতির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিল, যার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। দিন-রাত ঘরবন্দি হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছিলেন বাসিন্দারা। অবশেষে বন দপ্তরের দীর্ঘ ও নিরলস প্রচেষ্টায় বাঘটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা স্বস্তি ফিরিয়েছে গোটা এলাকায়।

বন দপ্তর সূত্রে খবর, বাঘিনীটিকে ধরতে গত কয়েক ঘণ্টা ধরে আসামের ঘন জঙ্গলে এক বিশেষ অভিযান চালানো হয়। বাঘিনীটিকে ট্র্যাক করার জন্য বনকর্মীরা আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি তিনটি প্রশিক্ষিত ‘কুঙ্কি’ হাতির সাহায্য নিয়েছিলেন। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর অবশেষে বাঘিনীটিকে লক্ষ্য করে চেতনানাশক ইনজেকশন ছোড়া হয় এবং তাকে কাবু করা সম্ভব হয়। বর্তমানে বাঘিনীটি বন দপ্তরের বিশেষ মেডিকেল টিমের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। চিকিৎসকদের দাবি, বাঘিনীটির শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল।

বন আধিকারিকদের মতে, বাঘিনীটি গত কয়েক দিনে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের গণ্ডি পেরিয়ে আসামের সীমানায় ঢুকে পড়েছিল। বারবার লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসা এবং মানুষের বসতি এলাকায় তার অবাধ যাতায়াতের ঘটনা বনকর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। ৩৪ দিনের মধ্যে এটি তৃতীয়বার, যখন বাঘিনীটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাঙ্কুলাইজারের সাহায্য নিতে হলো। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ইতিমধ্যে বাঘিনীটির শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ শুরু করেছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এবং বারবার অচেতন হওয়ার কারণে তার শরীরে কোনো অভ্যন্তরীণ আঘাত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের এই বাঘিনীটি গত কিছুদিন ধরে ক্রমাগত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিল, যা বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের কাছে রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাঘের স্বাভাবিক আচরণ থেকে বিচ্যুত হওয়ার এই কারণ অনুসন্ধানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাকে একটি সুরক্ষিত জায়গায় রাখার স্থায়ী বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। বাঘিনীটিকে দ্রুত তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা আলোচনা চালাচ্ছেন। এই অভিযানে বনকর্মীদের অসীম ধৈর্য, সাহস এবং কুঙ্কি হাতিদের ভূমিকা স্থানীয় মানুষের বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বাঘিনীটির গতিবিধির ওপর নজর রাখতে বন দপ্তর ড্রোন ও ক্যামেরা ট্র্যাপের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করেছিল। বাঘিনীটি কেন বারবার লোকালয়ের দিকে চলে আসছে এবং কেন সে তার স্বাভাবিক এলাকা ছেড়ে বারবার বেরিয়ে পড়ছে, তা নিয়ে বন দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত তদন্ত রিপোর্ট তৈরির কাজও চলছে। আগামী কয়েক দিন বাঘিনীটিকে কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে, যাতে সে পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে বন দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা আজ একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এই বৈঠকে বাঘিনীটির ভবিষ্যৎ আবাসস্থল এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত বন দপ্তরের তৎপরতায় এলাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।