শিয়ালদহের পার্কে দুই দুর্গাপুজোর অনুমতি দিল কলকাতা হাইকোর্ট

কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক এক ঐতিহাসিক রায়ের ফলে শিয়ালদহ এলাকার একটি জনবহুল পার্কে দুটি দুর্গাপুজো আয়োজনের দীর্ঘদিনের আইনি জট ও বিতর্কের অবসান ঘটল। উৎসবের প্রাক্কালে আদালতের এই যুগান্তকারী নির্দেশ আয়োজক কমিটিগুলির মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা ও স্বস্তির বাতাবরণ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ের ইতি টানার মাধ্যমে আদালত প্রমাণ করে দিল যে, নিয়মের বেড়াজালে বন্দি উৎসবের আনন্দকে আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আলোর মুখ দেখানো সম্ভব।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন অত্যন্ত ব্যস্ততম এলাকায় অবস্থিত ওই পার্কটি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে দুর্গাপুজোর অনুমতি পাওয়া নিয়ে দুটি ভিন্ন ক্লাব কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিবাদ চরম আকার ধারণ করেছিল। জনবহুল এলাকা এবং শিয়ালদহ স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কথা মাথায় রেখে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন শুরুতে পুজোর অনুমতি প্রদানে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। প্রশাসনের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, দুটি পৃথক পুজো পাশাপাশি হলে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি ভিড় সামলানো এবং অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এই প্রশাসনিক জটিলতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই মামলাটি কলকাতা হাইকোর্টে ওঠে।

দীর্ঘ শুনানির পর, মাননীয় বিচারপতি উভয় পক্ষের আইনজীবী এবং স্থানীয় প্রশাসনের রিপোর্ট সবিস্তারে পর্যালোচনা করেন। জনস্বার্থ এবং উৎসবের ঐতিহ্যকে মান্যতা দিয়ে আদালত নির্দেশ দেয় যে, সঠিক নিয়ম মেনে এবং নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে ওই পার্কে পুজোর আয়োজন করা সম্ভব। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, উৎসবের নামে পরিবেশের কোনো ক্ষতি করা চলবে না। বিশেষ করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজ্য সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। পার্কের গাছপালা বা সামগ্রিক কাঠামোর ক্ষতি করা যাবে না এবং জনচলাচলের রাস্তায় কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। আদালতের এই নির্দেশনার ফলে আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস না করেই এখন পুজো কমিটির সদস্যরা উৎসবের প্রস্তুতি শুরু করার বৈধ অধিকার পেলেন।

এই আইনি প্রক্রিয়ার আবহে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বেশ উত্তপ্ত ছিল। শাসক দল এবং বিরোধী পক্ষ এই পুজোকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ অবস্থানে অনড় ছিল। বিরোধী দলনেতা এবং শাসক দলের নেতৃত্বের তরফে উৎসবের মরসুমে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার আবেদন জানানো হয়েছে। তবে এই মামলার ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক মতভেদ সরিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণকেই চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সমীকরণের এই লড়াইয়ে যাতে সাধারণ মানুষের উৎসবের আনন্দ কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেদিকে নজর রাখতে প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পুজোর দিনগুলোতে যেন এলাকাভিত্তিক বাড়তি পুলিশি নজরদারি বজায় থাকে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মাথাচাড়া দিতে না পারে।

প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দমকল, বিদ্যুৎ দপ্তর এবং কলকাতা পৌরসংস্থার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেতে পুজো কমিটিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সমস্ত নথিপত্র নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বলা হয়েছে। যেহেতু এলাকাটি শিয়ালদহ স্টেশনের অতি নিকটে, তাই দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ট্রাফিক ব্লু-প্রিন্ট বা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। স্টেশনের যাত্রী সাধারণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যাতে কোনো সমন্বয়ের অভাব না ঘটে, তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের কথাও ভাবা হয়েছে।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ আদালতের এই রায়কে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের অনেকের মতে, শিয়ালদহ অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই উৎসবমুখর। দীর্ঘদিনের এই আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটায় বাসিন্দারা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তবে সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকা বাঞ্ছনীয়। পুজো কমিটির প্রতিনিধিদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই আদালতের আরোপিত শর্ত লঙ্ঘিত না হয়।

পরিশেষে বলা যায়, কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশ শুধুমাত্র দুটি পুজো আয়োজক কমিটিকেই সুবিধা দেয়নি, বরং আইনের শাসনের জয় নিশ্চিত করেছে। উৎসবের মরসুমে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার আগে শিয়ালদহের বাসিন্দারা এখন পুজোর থিম ও মণ্ডপ সজ্জার পরিকল্পনা নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততায় মেতে উঠেছেন। আদালতের এই রায় আগামী দিনে এ ধরনের বিবাদের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেখানে আইন ও আনন্দ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। প্রশাসন, পুজো কমিটি এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে শিয়ালদহের এই পুজো শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেবে, এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।