চন্দ্রনাথ রথ হত্যা: ২ কোটির সুপারি এল কোথা থেকে? প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রীর

নন্দীগ্রামের নতুন বিধায়কের শপথ ও চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড়

কলকাতা: নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে অভাবনীয় জয়ের পর বিধানসভার অন্দরে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল রাজ্যবাসী। বিধানসভার বিধায়ক হিসেবে শপথ নিলেন হাসিরানি রথ। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা তথা নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। এদিন বিধানসভার পবিত্র কক্ষে দাঁড়িয়ে রাজ্যের শাসকদলের তীব্র সমালোচনা করে নিজের দলের প্রয়াত কর্মী চন্দ্রনাথ রথের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীরা কোনো অবস্থাতেই রেহাই পাবে না এবং এর নেপথ্যে থাকা মূল ষড়যন্ত্রী তথা মাস্টারমাইন্ডকেও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।

তদন্তের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে শুভেন্দু জানান, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই ইতিমধ্যেই এই চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় মোট সাত জনকে গ্রেফতার করেছে। খুনের কাজে সরাসরি অংশগ্রহণকারী শ্যুটার এবং সুপারি কিলার—সবাই এখন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার জালে বন্দি। তবে তদন্তের আসল মোড় এখনও বাকি। শুভেন্দু অধিকারীর ভাষায়, “তদন্ত অনেকটা এগিয়েছে এবং মূল অভিযুক্তরা ধরা পড়েছে, কিন্তু প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া এখনও বাকি। বিশেষ করে ২ কোটি টাকার সুপারি কে দিয়েছিল, সেই অর্থের জোগানদাতা কে, তা খুঁজে বের করাটাই এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য।”

এই প্রসঙ্গেই রাজ্যের বর্তমান শাসক দলের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি একাধিক হাইপ্রোফাইল জায়গার দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এই ২ কোটি টাকার বরাত আসলে কোথা থেকে এসেছিল—ক্যামাক স্ট্রিট থেকে, কালীঘাট থেকে, নাকি ডায়মন্ড হারবারের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এই টাকা পাঠিয়েছিলেন? সিবিআইয়ের তদন্তে সেই আর্থিক লেনদেনের সূত্রটি বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। যেদিন এই টাকার আসল উৎস এবং নেপথ্যের কুশীলবদের নাম জানা যাবে, সেদিনই এই তদন্তের বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।”

উল্লেখ্য যে, হাসিরানি রথের সুযোগ্য পুত্র চন্দ্রনাথ রথ ভারতীয় বায়ুসেনায় কর্মরত ছিলেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে এমন মর্মান্তিক ভাবে খুনের ঘটনায় রাজ্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রবল শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এদিন হাসিরানি রথকে অভিনন্দন জানিয়ে আবেগপ্রবণ শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “হাসিরানি মহাশয়ার তরতাজা পুত্রকে নির্মম ভাবে খুন করা হয়েছে। তিনি দেশসেবা করেছিলেন, তাই তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার পূর্ণ যোগ্য দাবিদার। আমার গভীর বিশ্বাস, সিবিআই এই হত্যাকাণ্ডের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করবে এবং সত্য সামনে আনবে।”

একই সঙ্গে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে হাসিরানি রথের এই বিপুল জয়কে তিনি সাধারণ মানুষের রায় হিসেবেই দেখছেন। এদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি নন্দীগ্রামের আপামর জনতাকে কৃতজ্ঞতা জানান। প্রসঙ্গত, শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় নিজের আগের আসন ছেড়ে নন্দীগ্রামে হাসিরানিকে প্রার্থী করেছিলেন। কেন তিনি নিজের কেন্দ্র ছেড়েছিলেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “নন্দীগ্রামের মানুষ আমার কাছে অভিমান করে বলেছিলেন, আমি কেন ভবানীপুর ছাড়তে পারলাম না। আসলে ভবানীপুর ছাড়লে যিনি আমার কাছে দু-বার পরাজিত হয়েছেন, তিনি পুনরায় নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যেতেন। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর এখন বিশ্রামের সময়, রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত। আমি সেই সুযোগ তাঁকে দিতে চাইনি।”

মুখ্যমন্ত্রী তথা বিরোধী দলনেতার বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, হাসিরানি রথের জয় আসলে একটি শহীদ পরিবারের জয়। নন্দীগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা হাসিরানি রথের মাধ্যমেই পূরণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এদিকে চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলায় সিবিআইয়ের তদন্ত যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে রাজ্যের শাসকদলের অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। এখন দেখার বিষয়, তদন্তকারী সংস্থা ২ কোটির ওই আর্থিক লেনদেনের কিনারা করতে গিয়ে আগামী দিনে আর কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম সামনে আনে। যদিও এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা কোনো নির্দিষ্ট নাম এখনও সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে রাজ্যের রাজনৈতিক বাতাবরণে এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এক গভীর টানাপোড়েন যে অব্যাহত, তা বলাই বাহুল্য। পুরো ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখছে রাজ্যবাসী এবং রাজনৈতিক মহল।