পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক কাজকর্মের ক্ষেত্রে এবার বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখ থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি দপ্তরে এই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশের প্রেক্ষিতেই রাজ্য সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রশাসনিক স্তরে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার এবং প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দেশের প্রতিটি রাজ্যকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে সরকারি কাজকর্ম এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতীয় ভাষাগুলোকে আরও বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই বার্তার সূত্র ধরেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যজুড়ে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে আরও সুনিশ্চিত করতে এই নতুন নির্দেশিকা জারি করল।
নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি চিঠিপত্র, বিজ্ঞপ্তি এবং প্রশাসনিক নথিপত্র বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একইসঙ্গে, কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের যে সমস্ত দাপ্তরিক যোগাযোগ বা পত্রালাপ হবে, সেখানে হিন্দি এবং বাংলা—উভয় ভাষারই ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, এখন থেকে দ্বিভাষিক পদ্ধতিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন হবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় করা। সাধারণ মানুষ যাতে সরকারি পরিষেবা এবং সিদ্ধান্তগুলো সহজভাবে নিজের ভাষায় বুঝতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। একইসঙ্গে, ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা ও প্রসারের ক্ষেত্রেও এই পদক্ষেপ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছে রাজ্য প্রশাসন।
এই নতুন নিয়ম চালু হওয়ার ফলে সরকারি দপ্তরে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য কিছুটা হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দাপ্তরিক কাজে কোন কোন ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহৃত হবে বা তার রূপরেখা কী হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যের এই উদ্যোগ বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাকেও বাড়িয়ে তুলবে।
রাজ্যের প্রতিটি জেলা প্রশাসনকে ইতিমধ্যে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকেই যাতে প্রতিটি দপ্তরে এই নিয়ম কার্যকর করা সম্ভব হয়, তার জন্য পরিকাঠামোগত প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলার এই ব্যবহারকে কার্যকর করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও ডাকা হতে পারে বলে নবান্ন সূত্রের খবর।
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে নানা বিতর্ক ও দাবি ছিল। প্রশাসনিক কাজকর্মের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহার সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ভাষাতাত্ত্বিকরা। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে বড়সড় বদল আসতে চলেছে। সাধারণ নাগরিকরাও সরকারের এই পদক্ষেপে যথেষ্ট আশাবাদী, কারণ এতে সরকারি কাজের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগ আরও সহজতর ও সাবলীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি কর্মীদের কাজের ধরনেও পরিবর্তন আসবে। এখন থেকে সরকারি নথিপত্র তৈরির সময় বাংলা ব্যাকরণ এবং পরিভাষার ব্যবহারের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের সফল রূপায়ণের জন্য সরকারি কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ১ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা নির্ধারণ করে সরকার যে কড়া বার্তা দিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে, বাংলা ভাষার ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিতে রাজ্য প্রশাসন কোনো খামতি রাখতে চায় না।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনিক সংস্কারের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই পদক্ষেপ এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, জাতীয় স্তরে অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি বাংলার গুরুত্ব যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এই সিদ্ধান্ত সেই সত্যকেই আরও একবার জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করল।








