শিয়ালদহ ডিভিশনে ৫১টি পূজা স্পেশাল ট্রেন চালাবে পূর্ব রেল

আসন্ন দুর্গাপূজার মহোৎসবকে কেন্দ্র করে আপামর বাঙালির মনে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়, তা সামাল দিতে এবং যাত্রীদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও সুগম করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল পূর্ব রেল। পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় জানানো হয়েছে যে, শিয়ালদহ ডিভিশন থেকে সব মিলিয়ে মোট ৫১টি পূজা স্পেশাল ট্রেন চালানো হবে। উৎসবের এই মরসুমে শহরতলি এবং দূরপাল্লার যাত্রীদের যাতায়াত যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয় এবং বড় স্টেশনগুলিতে যাত্রীদের অত্যধিক ভিড়ের চাপ যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই বিশেষ ট্রেন পরিষেবা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছরই পূজার সময় যাত্রীদের সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়, আর সেই চাহিদাকে মাথায় রেখেই রেল মন্ত্রক এই বাড়তি প্রস্তুতির পথে হেঁটেছে।

পূর্ব রেলের এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিয়ালদহ থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী ট্রেনগুলির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষত ষষ্ঠী থেকে নবমী—এই চার দিন যখন ঠাকুর দেখতে বেরোনো মানুষের ঢল নামে রাস্তায়, তখন লোকাল ট্রেনগুলিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। সেই চাপের কথা মাথায় রেখেই রেল কর্তৃপক্ষ বিশেষ সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। শুধু শিয়ালদহ মেইন লাইন নয়, বরং বনগাঁ, রানাঘাট, বারুইপুর এবং হাসনাবাদ শাখাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে এই বিশেষ ট্রেনগুলি চলাচল করবে। রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ট্রেনের সময়সূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে অফিস ফেরত কর্মজীবী মানুষ এবং প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ঠাকুর দেখতে চাওয়া উৎসবপ্রেমী—উভয়ই সমানভাবে উপকৃত হন। তবে যাত্রীদের সুবিধার্থে এই সমস্ত ট্রেনগুলির সঠিক সময়সূচি, কোন কোন স্টেশনে থামবে এবং কতক্ষণ অন্তর চলবে, তার বিস্তারিত তথ্য ইতিমধ্যেই রেলের নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, ট্রেনে ওঠার আগে বা স্টেশনে যাওয়ার আগে যেন তারা এই সময়সূচিটি একবার যাচাই করে নেন।

রাজ্যের বর্তমান রাজনীতিতে পরিবহন ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রেল পরিষেবা ও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তোলা হলেও, ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে রেল কর্তৃপক্ষ এবারের উৎসবের মরসুমে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে প্রয়াস চালিয়েছে, তা ইতিবাচক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেলমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে যে পরিকাঠামো বা নেটওয়ার্ক তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, বর্তমান সময়ে সেই পরিকাঠামোকে আরও আধুনিক করার কাজ চলছে বলে রেল আধিকারিকরা দাবি করেছেন। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে রেল পরিষেবাকে আরও জনবান্ধব করে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য।

নিরাপত্তার প্রশ্নে শিয়ালদহ স্টেশনে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে। পুজোর দিনগুলিতে সাধারণ যাত্রীদের সুরক্ষার স্বার্থে অতিরিক্ত আরপিএফ (রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স) মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্লাটফর্মে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, টিকিট কাউন্টারে চাপ কমানো এবং প্ল্যাটফর্মের বিশৃঙ্খলা রোধ করতে স্মার্ট কার্ড এবং অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থায় বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক জানিয়েছেন যে, এই উৎসবের দিনগুলিতে যাত্রীদের কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হতে না হয়, সেজন্য রেলের তরফে একটি ‘বিশেষ মনিটরিং সেল’ ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে।

উল্লিখিত ৫১টি স্পেশাল ট্রেনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ট্রেন রাতেও চলাচল করবে। মূলত যারা গভীর রাত পর্যন্ত শহরজুড়ে প্রতিমা দর্শন করবেন, তাদের ঘরে ফেরার সুবিধার্থে এই বিশেষ রজনীকালীন পরিষেবার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রেলের এই সুচিন্তিত পদক্ষেপ উৎসবের দিনগুলিতে শহরতলির মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল এবং প্রাণবন্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদি কোনো যাত্রী ট্রেনের সময় বা অন্যান্য কোনো পরিষেবা নিয়ে অভিযোগ জানাতে চান, তবে তারা অনায়াসেই রেলের হেল্পলাইন নম্বর ১৩৯-এ যোগাযোগ করতে পারেন। পুজোর আনন্দকে নির্বিঘ্ন করতে রেলের এই বিশেষ পরিষেবা সাধারণ মানুষকে নিশ্চিতভাবেই এক বড় স্বস্তি দেবে।

প্রসঙ্গত, এই ৫১টি বিশেষ ট্রেনের পাশাপাশি নিয়মিত দূরপাল্লার ট্রেন এবং লোকাল ট্রেনের পরিষেবা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে। তবে ভিড়ের মাত্রার ওপর নির্ভর করে পরবর্তীতে প্রয়োজনে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে কি না, সে বিষয়ে রেলের শীর্ষস্তর থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রেলের এই বিশেষ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নিত্যযাত্রীরা। উৎসবের মরসুমে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় এবং প্রতিটি মানুষ যেন নিরাপদে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে বলে রেল প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে পূর্ব রেল সবসময় বদ্ধপরিকর। প্রতিটি স্টেশনে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত টিকিট কাটার জন্য স্বয়ংক্রিয় ভেন্ডিং মেশিনের ব্যবহার বৃদ্ধি করার ফলে যাত্রীরা অনেকটাই উপকৃত হচ্ছেন। পরিশেষে বলা যায়, রেলের এই সামগ্রিক প্রস্তুতি এবারের দুর্গাপূজাকে এক অনন্য মাত্রা প্রদান করতে চলেছে।