ভারতের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দেমাতরম’-কে অবমাননা করার ঘটনা এবার থেকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বুধবার ‘প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’ ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে পাশ হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। জাতীয় মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আইনজ্ঞরা।
দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার পাশাপাশি জাতীয় স্তোত্রকেও সমমর্যাদা দেওয়া হোক এবং তার অবমাননা রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা রাখা হোক। সেই লক্ষ্যেই এই সংশোধনী বিল আনা হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বিলের উদ্দেশ্য হলো জনসমক্ষে বা অন্য কোনো উপায়ে জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা।
উল্লেখ্য, বর্তমানে জাতীয় পতাকাসহ অন্যান্য জাতীয় প্রতীকের অবমাননা রুখতে বিদ্যমান আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু জাতীয় স্তোত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কঠোর আইনি সুরক্ষা ছিল না। এই নতুন সংশোধনীটি সেই আইনি ফাঁকফোকর পূরণ করবে। সংসদের ভেতরে আলোচনার সময় সরকার পক্ষের সাংসদরা দাবি করেন, ‘বন্দেমাতরম’ কেবল একটি গান নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা। বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা এই গান গাইতে গাইতে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছিলেন। তাই এর মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক এবং আইনি দায়িত্ব।
বিলে প্রস্তাবিত শাস্তির ধারা অনুযায়ী, দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ড বা আর্থিক জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। যদিও এই আইনের প্রয়োগ পদ্ধতি এবং শাস্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে বিশদ বিবরণ চূড়ান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তির পর স্পষ্ট হবে। বর্তমান খসড়া অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় স্তোত্র গাওয়ার সময় বা পরিবেশনার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেন অথবা স্তোত্রটির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেন, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে জাতীয় প্রতীকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যিক। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এই ধরনের আইনি সুরক্ষা দেশবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবোধকে আরও সুদৃঢ় করবে। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এই বিলটি পাশ হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে।
রাজ্যসভায় বিলটি নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন বিরোধীদের পক্ষ থেকে কিছু সংশোধনী প্রস্তাব আনা হলেও, শেষ পর্যন্ত ধ্বনি ভোটেই বিলটি অনুমোদিত হয়। বিলটি এখন রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর তা সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আইনে পরিণত হবে। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর জাতীয় স্তোত্র অবমাননার ক্ষেত্রে পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
তবে এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে কিছু উদ্বেগের কথাও বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসছে। বিরোধীদের একাংশের মতে, আইনের সংজ্ঞা যেন এতটাই স্পষ্ট রাখা হয় যাতে অহেতুক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কাউকে হতে না হয়। এই বিষয়ে সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, আইনের ধারাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কেবল জাতীয় স্তোত্রের চরম অবমাননার ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হবে। বাক-স্বাধীনতা এবং জাতীয় মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এই আইন প্রয়োগ করা হবে।
সর্বোপরি, এই বিলের মাধ্যমে ভারত সরকার একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দাবি পূরণ করল। ‘বন্দেমাতরম’ স্তোত্রের সঙ্গে ভারতবাসীর আবেগ জড়িয়ে আছে। তাই জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে একে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার এই পদক্ষেপকে দেশের নাগরিক সমাজ স্বাগত জানিয়েছে। বিলের খুঁটিনাটি ও শাস্তির মাত্রা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের তরফ থেকে আইনের খসড়াটি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া চলছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ইতিমধ্যে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে।








