কলকাতা পুলিশ প্রশাসনের সদর দপ্তর লালবাজারে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারী নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপের সূচনা করেছেন। মহানগরের কর্মজীবী নারীরা যারা রাতে বাড়ি ফেরেন বা গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে কাজ করেন, তাদের নিরাপত্তায় এখন থেকে সদা তৎপর থাকবে ‘শাইনিং’ (SHINING) নামক একটি বিশেষ মহিলা পুলিশ পেট্রোলিং টিম। এই বিশেষ দলটি মূলত স্কুটার ও আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে শহরের অলিগলি এবং স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি চালাবে। মুখ্যমন্ত্রী জানান যে, নারীদের নিরাপত্তা কেবল স্লোগানে নয়, বরং পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এরই অংশ হিসেবে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং ট্রাফিক সিগন্যাল সংলগ্ন এলাকায় ‘পিঙ্ক বুথ’ স্থাপন করা হয়েছে। এই বুথগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে যেকোনো বিপদে পড়া নারী দ্রুত সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন এবং সরাসরি পুলিশি সহায়তা পান। প্রতিটি বুথে নারী পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে যারা তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ এবং ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। এই প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে কলকাতা পুলিশের আওতায় ২০টি পিঙ্ক বুথ এবং ১০টি শাইনিং পেট্রোল ইউনিট চালু করা হলো। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, কলকাতা ভারতের অন্যতম নিরাপদ শহর হিসেবে পরিচিত থাকলেও আমরা একে আরও নিশ্ছিদ্র করতে চাই। বিশেষ করে আইটি সেক্টর, হাসপাতাল এবং কল সেন্টারে কর্মরত নারীদের যাতায়াতের পথে কোনো ভয় বা সংকোচ থাকা উচিত নয়। পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল জানান, এই শাইনিং টিমের সদস্যরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তারা দ্রুত যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সক্ষম। শাইনিং দলের সদস্যদের জন্য বিশেষ ধরনের জ্যাকেট ও হেলমেট প্রদান করা হয়েছে যাতে দূর থেকেও তাদের উপস্থিতি বোঝা যায়। এছাড়া লালবাজার কন্ট্রোল রুমের সাথে এই পিঙ্ক বুথগুলো সরাসরি যুক্ত থাকবে। সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য এসওএস (SOS) অ্যালার্ম সিস্টেমের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে রাতের শহরে টহলদারি আরও বাড়ানো হোক। বিশেষ করে আরজি কর আবহে নারীদের মনে যে নিরাপত্তার অভাববোধ তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে তুলতে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রকল্পের ফলে রাতে কাজ করা নারীদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং অপরাধীদের মনে ভয়ের সঞ্চার হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও ঘোষণা করেন যে, আগামী দিনে জেলা শহরগুলোতেও পর্যায়ক্রমে এই পিঙ্ক বুথ এবং নারী পেট্রোলিং দল গঠন করা হবে। নারী ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তার এই মডেল সারা দেশের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পুলিশ বিভাগ সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রতিটি পিঙ্ক বুথে ফার্স্ট এইড বক্স, ইন্টারকম সুবিধা এবং মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট রাখা হয়েছে যাতে জরুরি মুহূর্তে কেউ বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়েন। রাতের কলকাতায় নারীদের পদচারণা নির্বিঘ্ন করাই এই মহতী উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শহরের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীরা। তারা মনে করছেন, পর্যাপ্ত আলো এবং পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতি অপরাধ প্রবণতা কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নারীদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সহ্য করা হবে না এবং দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোকেও কার্যকর রাখা হচ্ছে। শাইনিং টিমের সক্রিয়তা এবং পিঙ্ক বুথের সহজলভ্যতা কলকাতার রাতের নিরাপত্তায় এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করল।







