কলকাতা: রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং আসন বন্টন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুসংহত করতে সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তর। নতুন জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব পড়ুয়ারা ইতিমধ্যে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন, তারা আর পরবর্তী পর্যায়ে আয়োজিত ডিকেন্দ্রিক বা ডিসেন্ট্রালাইজড কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই অংশ নিতে পারবেন না। রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষা পরিকাঠামোয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি বর্তমানে শিক্ষামহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল কলেজে ডিকেন্দ্রিক কাউন্সেলিং প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নানা জটিলতা ও বিতর্ক তৈরি হচ্ছিল। বহু ক্ষেত্রে এমন ঘটনা সামনে এসেছে যেখানে একজন পড়ুয়া একটি কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেও কেবল নিজের পছন্দের কলেজ বা পছন্দের বিষয় পাওয়ার আশায় এই ডিকেন্দ্রিক প্রক্রিয়ার সাহায্য নিচ্ছেন। এর ফলে মূল কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার পরবর্তী সময়ে যেসব আসন শূন্য পড়ে থাকছে, তা নিয়ে যেমন প্রশাসনিক স্তরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনই সামগ্রিক ভর্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। বর্তমান সরকারের শিক্ষা বিভাগ এই সমস্ত অব্যবস্থা দূর করতে এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্থায়িত্ব আনতে এই দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। রাজ্যের প্রাক্তন প্রশাসনিক জমানায় কাউন্সেলিং পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ধরনের পদ্ধতি অনুসৃত হতো, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের মধ্যে বিস্তর অভিযোগ ছিল। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল এই গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে এবং প্রতিটি পড়ুয়ার মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। যদিও বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছে, তবে উচ্চশিক্ষা দপ্তর তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য, যাতে সেশন জট তৈরির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।
এই নতুন নিয়মের কার্যকারিতা সম্পর্কে দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি কোনো পড়ুয়া কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে যান, তবে তার নাম সেই প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সাথে সরকারি পোর্টালে যুক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে সেন্ট্রাল সার্ভারে ওই পড়ুয়ার নাম ‘ভর্তি’ বা ‘অ্যাডমিটেড’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে যাবে। ফলস্বরূপ, পরবর্তী ধাপে ডিকেন্দ্রিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য নির্ধারিত পোর্টালে তাদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। দপ্তরের স্পষ্ট বার্তা, এই ব্যবস্থার ফলে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা মেধাবী পড়ুয়ারা, যারা প্রথম পর্যায়ে সুযোগ পাননি, তারা শূন্য আসনগুলিতে ভর্তি হওয়ার বাড়তি সুযোগ পাবেন।
ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এই মর্মে কঠোর নির্দেশিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কলেজকে তাদের ভর্তি হওয়া পড়ুয়াদের যাবতীয় তথ্য অবিলম্বে সরকারি পোর্টালে নির্ভুলভাবে আপডেট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যে সকল পড়ুয়া ইতিমধ্যে একটি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর সেটি বাতিল করে পুনরায় কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অন্য কোনো ভালো কলেজে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে চলেছে। যদিও অনেক অভিভাবক এই নতুন বিধিনিষেধ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন, তবুও সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার গণ্ডিতে ফিরিয়ে আনতে এবং মেধার সঠিক ব্যবহারের স্বার্থে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের একাংশ।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্ররা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে অনেক মেধাবী পড়ুয়া তাদের পছন্দের কলেজে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। অন্যদিকে, রাজ্যের শাসকদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অহেতুক জল্পনা তৈরি না করে প্রকৃত মেধাবীদের ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষা দপ্তরের এই নতুন নির্দেশিকা আগামী শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া থেকেই কার্যকর হতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশিকা উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটেই পাওয়া যাচ্ছে। কোনো পড়ুয়া যদি একান্তই বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে ভর্তি বাতিল করতে চান, সেক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে বা তাদের জন্য বিশেষ কোনো ছাড় থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনও বিশদ তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পরবর্তী নির্দেশিকার অপেক্ষায় দিন গুনছেন পড়ুয়ারা এবং অভিভাবকরা। তবে এটি স্পষ্ট যে, শিক্ষাদপ্তর এবার কোনো রকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই দ্রুতগতিতে সেশন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।








