বিসর্জন পোস্ট বিতর্ক: কুণাল ঘোষের বাড়িতে পুলিশ, গ্রেফতারির হুঁশিয়ারি

কলকাতা: দুর্গাপূজার বিসর্জন সংক্রান্ত একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এই বিতর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম পরিচিত মুখ তথা প্রাক্তন বিধায়ক কুণাল ঘোষের সুকিয়া স্ট্রিটের বাসভবনে হাজির হলেন পুলিশ আধিকারিকরা। হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটের গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে এই সংক্রান্ত বিষয়ে একটি আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতায় রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত কুণাল ঘোষের সাম্প্রতিক একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। ওই পোস্টে তিনি শারদীয়া দুর্গাপূজার বিসর্জন ও প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন, যা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কুণাল ঘোষের করা ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই মূলত পুলিশের এই তৎপরতা। পুলিশি নোটিসের বয়ান অনুযায়ী, কুণাল ঘোষকে আগামী চার দিনের মধ্যে ওই পোস্টের প্রেক্ষিতে যথাযথ কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যদি তিনি সদুত্তর না দেন, তবে তাঁকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হতে পারে বলে নোটিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করেছেন কুণাল ঘোষ নিজেই।

তবে পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন কুণাল ঘোষ। তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের অবস্থানে অনড় থাকার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো চাপের মুখে নতিস্বীকার করে তিনি তাঁর করা ফেসবুক পোস্টটি ডিলিট করবেন না। কুণাল ঘোষ বলেন, “পুলিশ নোটিস দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমি আমার মন্তব্যের স্বপক্ষে অটল। পোস্ট সরিয়ে নেওয়ার বা ভয় পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” তাঁর এই অনড় মনোভাব রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্যের শাসক দল এবং তাদের নেতাদের এই ধরণের আচরণ আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী। তারা মনে করছেন, প্রশাসনকে নিজের মতো করে ব্যবহারের ফলশ্রুতিই হলো এই ধরণের ঘটনা। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে এই বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের পেছনে সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ এবং কেন এত দ্রুত গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো, তা নিয়ে এখনো জনমানসে ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনমানসে উত্তেজনার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রশাসন এই ধরণের কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার পথ খোলা রেখেছে।

উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে কুণাল ঘোষের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে চর্চা হয়েছে। তবে এবারের ঘটনাটি সরাসরি পুলিশি নোটিস এবং গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি পর্যন্ত গড়িয়ে যাওয়ায় তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। গোয়েন্দা দপ্তরের পক্ষ থেকে এই মামলাটি ঠিক কোন ধারায় নথিভুক্ত করা হয়েছে বা এই তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী হতে চলেছে, সেই বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য বা সরকারি বয়ান এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি। কুণাল ঘোষের বাড়ির সামনে পুলিশের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সুকিয়া স্ট্রিট এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা এবং পথচারীরা পুলিশের এই উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন।

আগামী চার দিনের মধ্যে এই আইনি জটিলতা কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের ওয়াকিবহাল মহল। রাজ্য রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেখানে শাসকদল এবং বিরোধীদের মধ্যে সংঘাতের বাতাবরণ চরমে, সেখানে এই ধরনের আইনি টানাপোড়েন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। আইনি লড়াই এবং বাক-স্বাধীনতার এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কার জয় হয়, তা সময়ই বলবে। তবে এই ঘটনা যে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও এক নতুন অস্থিরতার সংকেত বহন করছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আপাতত কুণাল ঘোষের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং পুলিশের কঠোরতার পরিধি নিয়ে রাজ্য জুড়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। এই ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে থাকার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে যে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট কতটা আইনি বাধার সম্মুখীন হতে পারে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে সব পক্ষই।