কলকাতা: কামদুনি ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বুধবার রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করলেন। উত্তর ২৪ পরগনার কামদুনিতে নির্যাতিতার বাড়িতে গিয়ে তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। এই ঘটনার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি নিয়ে তিনি পরিবারের উদ্বেগ শোনেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেন যে, এই লড়াইয়ে তিনি এবং তাঁর দল সর্বদা পাশে থাকবেন।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলাটি রাজ্যজুড়ে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার এত বছর পরেও বিচার পাওয়ার প্রতীক্ষায় থাকা পরিবারের যন্ত্রণা এবং অসহায়তা আজও অম্লান। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী এদিন দাবি করেন, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আইনি লড়াইকে আরও জোরালো করা প্রয়োজন। তিনি পরিবারের লোকজনকে আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রয়োজনে তিনি আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত স্তরে বিষয়টি নিয়ে সরব হবেন যাতে ন্যায়বিচার পেতে দেরি না হয়।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি নৃশংস ঘটনার বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং অমানবিক। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াটি যেভাবে চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের আস্থা টলে যাচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কামদুনি মামলাটি বাংলার বিচার ব্যবস্থার কাছে একটি বড় পরীক্ষা।
সাক্ষাৎ শেষে শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, নির্যাতিতার পরিবারকে একা মনে করার কোনো কারণ নেই। তারা যে লড়াই করছেন, সেই লড়াইয়ে ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তিনি তাদের পাশে থাকবেন। তিনি দাবি করেন যে, রাজ্য সরকারের উচিত এই ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ব্যবস্থা করা। এছাড়া তিনি এই মামলার সাথে যুক্ত নথিপত্র এবং আইনি পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা নিয়েও খোঁজখবর নেন।
উল্লেখ্য, কামদুনি ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। আদালতের নির্দেশ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের রায়ের পরেও পরিবারের পক্ষ থেকে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের দাবি তোলা হয়েছে। বিরোধী দলনেতার এই সফরকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে যখন রাজ্যের নারী নিরাপত্তা নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলো, তখন এই ধরণের সফর সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুভেন্দু অধিকারীর এই সফর তাদের মধ্যে নতুন করে কিছুটা ভরসার সঞ্চার করেছে। তবে তাদের মূল লক্ষ্য একটাই— দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। বিচার ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তারা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অবিচল। বিরোধী দলনেতা এদিন সুস্পষ্টভাবে জানান যে, তিনি এই বিষয়টি নিয়ে রাজ্যপাল এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় স্তরেও আলোচনার পথ খোলা রাখবেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধরে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর ভরসা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং সরকারি উদাসীনতার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবশ্য এই সফরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে কটাক্ষ করা হয়েছে। শাসক দলের দাবি, নির্বাচনের আগে বা সময়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই বিরোধী দলনেতা এই ধরণের তৎপরতা দেখাচ্ছেন। তবে সেই বিতর্কে না গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী এদিন শুধুমাত্র নির্যাতিতার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি এবং বিচারের প্রতিশ্রুতির ওপরই আলোকপাত করেছেন। মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে এখন নজর সকলের। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে, তবে পরিবারের অদম্য জেদ এবং আইনি সহায়তায় ন্যায়বিচারের আশা এখনও বেঁচে রয়েছে।








