মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের আগস্ট মাস থেকে বিদেশ থেকে আমদানি করা সমস্ত জেনেরিক ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করা হবে। হোয়াইট হাউসের তরফে এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এবং ওষুধ শিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জন করতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের এই নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই ওষুধের উৎপাদন বাড়ানো। এতদিন মার্কিন বাজার সস্তায় জেনেরিক ওষুধের জন্য মূলত বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভর করত। ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে সেই নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে উৎসাহিত করাই প্রশাসনের প্রধান উদ্দেশ্য। হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের মতে, এই উচ্চ হারের শুল্কের ফলে বিদেশি সংস্থাগুলির পক্ষে সস্তায় ওষুধ রফতানি করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা আখেরে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলির জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দেবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, জেনেরিক ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে মার্কিন বাজারে ওষুধের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। কারণ, জেনেরিক ওষুধ মূলত সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। এখন যদি আমদানিকৃত ওষুধের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের স্বাস্থ্য বিমা ও চিকিৎসার খরচের ওপর। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশ, যারা বিশ্বের বৃহত্তম জেনেরিক ওষুধ রফতানিকারক, তারা এই নতুন শুল্ক নিয়মের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে। ওষুধ শিল্পে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বর্তমানে যে জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক দেশই ট্রাম্পের এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আলোচনার টেবিলে চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৮ সালের আগস্ট মাসের আগে এই নতুন আইন কার্যকর হওয়ার জন্য বেশ কিছু আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। মার্কিন কংগ্রেসের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দল এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি মার্কিন উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দিতে বদ্ধপরিকর এবং প্রয়োজনে তিনি এই ধরনের কঠোর বাণিজ্য নীতি অবলম্বন করতে পিছপা হবেন না।
বর্তমানে এই বিষয়ে বিস্তারিত আইনি খসড়া বা কোন কোন নির্দিষ্ট ওষুধের ওপর এই শুল্কের প্রভাব পড়বে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ওষুধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট মহল এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি এই বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্তের ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের গ্লোবাল মার্কেট শেয়ারে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা সময়ই বলবে।
সামগ্রিকভাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদের (Protectionism) নীতিকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এল। নিজের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবেই ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। আগামী নির্বাচনের আগে এই ধরনের সাহসী ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।








