ভারত-নেপাল সীমান্তে সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় মানবপাচারের অভিযোগে গুজরাতের এক বাসিন্দাকে গ্রেফতার করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ। অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি মিজোরামের দুই নাবালিকাকে নিয়ে নেপাল সীমান্তের দিকে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানরা অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে ওই ব্যক্তিকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি দেশের আন্তঃরাজ্য সীমান্ত সুরক্ষার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্ববহ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি মিজোরাম থেকে ওই দুই নাবালিকাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে এসেছিল। সীমান্ত অতিক্রম করার প্রাক্কালে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানদের মনে সন্দেহ জাগলে তারা ওই ব্যক্তিকে দাঁড় করানোর নির্দেশ দেয়। তল্লাশির সময় দেখা যায়, তার সঙ্গে থাকা দুই কিশোরী অত্যন্ত আতঙ্কিত এবং মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার পরেই মানবপাচারের এই ঘৃণ্য ছক প্রকাশ্যে আসে। ওই নাবালিকারা মিজোরামের বাসিন্দা বলে পরিচয় পাওয়া গেছে। ঠিক কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে তাদের সুদূর নেপাল সীমান্তে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর পাওয়া গেছে, অভিযুক্ত গুজরাতের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও বিগত কয়েক দিন ধরে সে মিজোরামে সক্রিয় ছিল। সেখানে কোনো সুসংগঠিত পাচার চক্রের সঙ্গে সে যুক্ত কিনা, তা নিয়ে জোরদার তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ। ধৃত ব্যক্তিকে জেরা করে এই পাচার চক্রের মূল হোতাদের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে যে, গত কয়েক মাসে সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কড়া করা হয়েছে, যার ফলেই এই ধরণের অসামাজিক ও বেআইনি কাজ মাঝপথেই আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, সীমান্ত সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই সাফল্যকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, বর্তমান শাসকদল বিজেপি তা কাটিয়ে ওঠার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজ্যের সীমানায় এই ধরণের ঘটনা নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি থেকে যেভাবে পাচারের ছক কষা হচ্ছে, তা প্রশাসনিক স্তরে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া ওই দুই নাবালিকাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। নাবালিকাদের সুরক্ষার খাতিরে তাদের নাম ও পরিচয় অত্যন্ত কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের কল ডিটেলস এবং সাম্প্রতিক গতিবিধি খুঁটিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া, মিজোরাম পুলিশের সঙ্গেও নিয়মিত সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে যাতে এই পাচার চক্রের শিকড় ঠিক কোথায়, তা খুঁজে বের করা যায়।
এই ঘটনাটি ফের একবার ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সীমান্তে নারী ও শিশু পাচারের বিপদজনক পরিস্থিতির দিকে আঙুল তুলেছে। নেপাল সীমান্ত দীর্ঘকাল ধরেই পাচারের অন্যতম করিডোর হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে সতর্কতা বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা আধিকারিকরা। ধৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবপাচার বিরোধী আইনের কঠোরতম ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশি জেরায় সে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে কিনা, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তদন্তকারী অফিসারদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি একটি বড় চক্রের অংশ হতে পারে, যার সঙ্গে একাধিক রাজ্যের অপরাধীদের যোগসাজশ থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। পুলিশ পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত দোষীদের কঠোরতম শাস্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষা ও শিশু সুরক্ষার নিরিখে এই অপারেশন বিএসএফ-এর পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।








