দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অন্ধ্রপ্রদেশের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল এবং সংলগ্ন জনপদ জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো একটি বিশালকায় বুনো হাতিকে অবশেষে খাঁচাবন্দি করতে সক্ষম হলেন বনদপ্তরের দক্ষ আধিকারিক ও কর্মীরা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই বুনো হাতিটির লাগাতার তাণ্ডব ও লোকালয়ে অবাধ বিচরণকে ঘিরে স্থানীয় গ্রামগুলির বাসিন্দাদের মধ্যে যে গভীর আতঙ্ক এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান ঘটল এই সফল অভিযানের মাধ্যমে। বনদপ্তরের আধিকারিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, হাতিটির প্রতিটি গতিবিধির ওপর গত ত্রিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সতর্কতার সঙ্গে নজর রাখা হচ্ছিল। অবশেষে বৃহস্পতিবার বনকর্মীদের দীর্ঘ ও নিরলস প্রচেষ্টার পর হাতিটিকে কাবু করা সম্ভব হয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশের সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের আধিকারিকরা বিস্তারিত তথ্যে জানিয়েছেন, গত বেশ কিছুদিন ধরে হাতিটি বনাঞ্চলের সীমানা পেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল। এর ফলে একের পর এক কৃষিজমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়িরও প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির কারণে একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা হাতিটির আক্রমণের ভয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গ্রামগুলিতে এক চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছিল এবং কৃষকরা তাদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। স্থানীয় কৃষকদের শস্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার ফলে তাদের আয়ের উৎসও সংকটের মুখে পড়েছিল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বনদপ্তর জরুরি ভিত্তিতে একটি বিশেষ অপারেশনাল টিম গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বনদপ্তরের এই বিশেষ টিমের সদস্যরা দিনের পর দিন জঙ্গল এবং গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে টহলদারি চালাচ্ছিলেন। হাতিটিকে ধরতে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হয়। ড্রোন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে উপর থেকে হাতিটির ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছিল এবং একই সঙ্গে ট্রানকুলাইজার গান বা চেতনানাশক ইনজেকশনের মাধ্যমে হাতিটিকে বশে আনার সুপরিকল্পিত ছক কষা হয়। অভিযান চলাকালীন বনকর্মীদের অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ঘন জঙ্গল এবং পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে হাতিটির সঠিক অবস্থান বারবার পরিবর্তন হচ্ছিল, যা কর্মীদের জন্য কাজটিকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। তবে অভিজ্ঞ ট্র্যাকার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে শেষ পর্যন্ত বনদপ্তর হাতিটির অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
অবশেষে যথাযথ পরিকল্পনা এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে হাতিটিকে কোনো প্রকার শারীরিক ক্ষতি না করেই অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে খাঁচাবন্দি করা হয়েছে। হাতিটি বর্তমানে বনদপ্তরের কঠোর ও বিশেষ পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা খতিয়ে দেখছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর হাতিটিকে জনবসতি থেকে অনেক দূরে কোনো নিরাপদ ও সংরক্ষিত গভীর বনাঞ্চলে স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এই খবরে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। এতদিন ধরে চলা এই আতঙ্কের অবসান ঘটায় গ্রামবাসীরা বনদপ্তরের কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। বন আধিকারিকদের মতে, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আসায় অনেক সময় তারা খাবারের খোঁজে লোকালয়ের দিকে চলে আসে। হাতিটিকে কেন বারবার লোকালয়ে আসতে হচ্ছিল এবং তার এই অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকাগুলিতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য বনদপ্তরের পক্ষ থেকে বাড়তি নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাতিটির পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাকে সংশ্লিষ্ট অভয়ারণ্যে বা তার আদি আবাসস্থলে ছেড়ে দেওয়া হবে। এই পুরো অভিযানের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ কোনো রকম আঘাত না দিয়ে বন্যপ্রাণীকে বশে আনা বনকর্মীদের জন্য ছিল একটি বড় পরীক্ষা। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে স্থানীয় গ্রামবাসীদের বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় চলাচলের সময় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বনদপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংঘাত নিরসনে তারা বদ্ধপরিকর এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলায় আরও আধুনিক প্রযুক্তি ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। আপাতত স্থানীয় গ্রামগুলিতে পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসতে শুরু করেছে।








